একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদ ও অপর্যাপ্ত মুল্ধনের ফলে কমে যাওয়া উৎপাদন। এসবের চাপে মানুষের আয় কমছে এবং কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অংশ হিসেবে ৫,০০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তা কি যথেষ্ট?
ধার দেওয়ার টাকা আছে, ধার নেওয়ার ভরসা নেই
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান ছবিটা এই এক বাক্যে ধরা যায়। আগস্টে ব্যাংকে আমানত দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায়, যা এক বছর আগের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি। অথচ বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ, পরিমাণ ১৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, আর গত বছর একই সময়ে বৃদ্ধি ছিল ৬.৩৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, টানা ছয় মাস এই প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে আটকে আছে। সংখ্যাটা আরও ভারী হয়ে ওঠে মূল্যস্ফীতির পাশে রাখলে। আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ।
অর্থাৎ টাকার অঙ্কে ঋণ বাড়লেও কেনার ক্ষমতার হিসাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।
কত দিন ধরে চড়া সুদ, আর ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
চাপটা নতুন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত নীতি সুদহার ৪.৭৫ শতাংশে রেখেছিল।
এরপর দফায় দফায় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরে রেকর্ড ১০ শতাংশে তোলে এবং সেখানেই রাখে। গত ৩০ জুলাই সেটি ৯.৫ শতাংশে নামানো হয়, যা ছয় বছরের মধ্যে প্রথম হ্রাস। কিন্তু ২৩ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যের ওপরে থাকা এবং জ্বালানির দাম ও নতুন পে স্কেলের সম্ভাব্য চাপের কারণে হার আর না কমিয়ে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ঋণগ্রহীতার পকেটে নীতি সুদহার নয়, ব্যাংকের গড় হারটাই লাগে। জুনে সব ব্যাংকের গড় ঋণ সুদহার ছিল ১১.৮৬ শতাংশ, আর আমানতে গড়ে ৬.১৬ শতাংশ। ফলে ব্যবধান ৫.৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ঘুরেফিরে দুই জায়গায় আসে, সুদ আর জ্বালানি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব বলেছিলেন, ঋণের সুদ ১৪ শতাংশের বেশি, অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সাধারণত ১০ থেকে ১১ শতাংশ মুনাফা করেন।
এ বছর বিকেএমইএ সভাপতি জানিয়েছেন, অনেক কারখানা অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় চলছে, কোনোটি এক তৃতীয়াংশে, আর ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমানের কথায়, শুধু সুদ কমালে চলবে না, আগে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি দরকার।
এক কারখানার মালিকের মাসিক হিসাব
ধরুন এক ছোট কারখানার মালিক। কাঁচামাল, শ্রমিকের বেতন আর বিদ্যুৎ বিলের জন্য তাঁর ৫০ লাখ টাকার চলতি মূলধন ঋণ দরকার। সব ব্যাংকের গড় হার ১১.৮৬ শতাংশ ধরলে বছরে সুদ প্রায় ৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, মাসে প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ টাকা। একই ঋণ ৯ শতাংশে পেলে মাসের সুদ নেমে আসত ৩৭ হাজার ৫০০ টাকায়। এই প্রায় ১২ হাজার টাকার ফারাক ছোট শোনায়। কিন্তু গ্যাস না পেয়ে কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চললে আয় অর্ধেক হয়, অথচ সুদ অর্ধেক হয় না। বড় প্রতিষ্ঠানও এই ফাঁদ থেকে মুক্ত নয়।
ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে এসেছে, জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এমজিআই গ্রুপ কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার দেড় থেকে আড়াই বছর পরও মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ গুনতে হচ্ছে। সুদের হিসাব উৎপাদনের হিসাব মানে না, সে ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে।
ব্যাংকে টাকা আছে, তবু ঋণ নেই কেন?
প্রথম কারণ হল ব্যাংকের নিজের অবস্থা। ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। ২০২৫ এর ডিসেম্বরে এই হার কিছুটা কমেছিল, কিন্তু তার পেছনে ছিল বড় আকারের ঋণ পুনঃতফসিল, প্রকৃত আদায় নয়।
২০২৬ এর মার্চে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ৩.১৭ শতাংশ, যেখানে বেসেল থ্রি অনুযায়ী প্রয়োজন ১২.৫ শতাংশ। জুনে প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মূলধন কম থাকলে ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বাড়াতে পারে না। এখানেই কাজে আসে জোসেফ স্টিগলিৎজ ও অ্যান্ড্রু ওয়াইসের ১৯৮১ সালের তত্ত্ব। তাঁরা দেখিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংক শুধু বেশি সুদ নয়, অনেক সময় ঋণ দেওয়াই সীমিত করে। কারণ সুদ বাড়ালে ভালো ঋণগ্রহীতারা সরে যান, আর রয়ে যান তাঁরাই, যাঁদের ঝুঁকি বেশি।
তাই জুনে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও ব্যাংক ঋণ ছাড়ার সাহস পায়নি।
সরকার, মূল্যস্ফীতি আর ডলার
দ্বিতীয় কারণ সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা। নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছে, যার ২৩ হাজার ২২৭ কোটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে।
আগের বছর একই সময়ে সরকার নিট ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। ডিসিসিআইর একটি উপস্থাপনা অনুযায়ী গত অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারিতে সরকারি ঋণ ছিল ৭৩ হাজার ৩৫ কোটি টাকা, আগের বছর একই সময়ে ৯ হাজার ৪৪২ কোটি।
অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলে একটি প্রভাব আছে যেখানে সরকার বেশি ধার নিলে বেসরকারি খাতের জন্য টাকা কমে যায়। কিন্তু যে ব্যাংক ব্যবস্থায় ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি অলস পড়ে আছে, সেখানে টাকার অভাব মূল সমস্যা হতে পারে না।
ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত আছে, এই অলস টাকার বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে যাচ্ছে। তাই বেশি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলো, ঝুঁকিহীন সরকারি কাগজ ব্যাংকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি ঋণের চেয়ে আকর্ষণীয়।
এর সঙ্গে যোগ করা যায় আর একটি দাবি। বণিকবার্তার প্রতিবেদনে দেখা যায়,এক ব্যাংক নির্বাহী বলেছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধির বর্তমান সংখ্যার বড় অংশ নতুন ঋণ নয়, বকেয়া সুদ মূলধনে যোগ হওয়ার ফল। সত্য হলে প্রকৃত নতুন ঋণ আরও কম। মূল্যস্ফীতির চাপও থামেনি।
সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশ হয়েছে, আর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব আসছে মাসগুলোতেও থাকবে বলে বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন।
ডলারের বাজার আগের চেয়ে অনেক শান্ত। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে টাকার মান ডলারের বিপরীতে মাত্র ০.৫৯ শতাংশ কমেছে, আর ৪ আগস্ট আন্তঃব্যাংকে ডলারের দাম ছিল ১২৩.৮১ টাকা।
এরপর ১২ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রেফারেন্স রেট ১২২.৮৯ টাকায় নেমে এসেছে। তবে চাপ পুরো কাটেনি। ব্যাংকগুলো ডলার আরও বেশি দামে বিক্রি করছে, আর খোলাবাজারে দাম ১২৬ থেকে ১২৭ টাকা।
অর্থাৎ যাঁরা আমদানি করেন, তাঁদের হিসাবে পুরোনো দামবৃদ্ধির খরচ রয়ে গেছে। এর ওপর যোগ হয়েছে জ্বালানি। গত অর্থবছরে পেট্রোলিয়ামের আমদানি বিল দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম হলো, কোনো প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় ঋণের খরচের চেয়ে বেশি হলে তবেই উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেন। গ্যাস না থাকলে, অর্ডার না থাকলে, সুদ ৯ শতাংশ হলেও প্রত্যাশিত আয় শূন্যের কাছে থাকে। তাই শুধু সুদের হারকে একক কারণ হিসেবে দেখা অপর্যাপ্ত।
ছোটদের কেন সবার আগে হোঁচট লাগছে?
সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্চ শেষে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) ঋণস্থিতি ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকায় নেমেছে।
গত বছর ডিসেম্বরের চেয়ে কমেছে ১৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা, কারণ বিতরণের চেয়ে আদায় বেশি হয়েছে (বিতরণ ৫২ হাজার ১০৮ কোটি, আদায় ৬৫ হাজার ২৯১ কোটি)।
মোট ঋণে এই খাতের অংশ ১৫.৮৭ শতাংশ, অথচ ২০২৬ সালের নিয়ন্ত্রক লক্ষ্য ২৫.৫০ শতাংশ। এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ডিসেম্বরের ২৪.০৩ থেকে বেড়ে ২৬.০৪ শতাংশ হয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ আর একাধিক ব্যাংকসম্পর্ক থাকে, ছোটদের থাকে না।
অর্থাৎ অর্ডার থাকলেও ব্যয় ও জ্বালানির চাপে দুর্বল কারখানা টিকতে পারছে না। দেশীয় বাজারনির্ভরদের সংকট অন্য ধরনের।
ঘোষণার পর কাজ কতটা হলো?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক হাত গুটিয়ে বসে নেই। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যার ৪১ হাজার কোটি আসবে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে।
এর মধ্যে ৮ জুন চালু হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার সিএমএসএমই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। ব্যাংক ৪ শতাংশে টাকা পায়, উদ্যোক্তা পান সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে, মেয়াদ তিন বছর।
কিন্তু ৮ সেপ্টেম্বরও ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে অংশগ্রহণ চুক্তি সই হচ্ছিল, অর্থাৎ ঘোষণার তিন মাস পরেও চুক্তি পর্ব চলছিল। যে ছোট প্রতিষ্ঠান আগে খেলাপি হয়েছে, সে সহজে এই সুবিধা পাবে না। ২৯ জুন থেকে ব্যবধান ৪ শতাংশীয় পয়েন্টে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, অথচ জুনে তা ছিল ৫.৭। ব্যাংকাররা বলছেন, তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন কঠিন এবং এতে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট ঋণ থেকে ব্যাংক আরও দূরে সরতে পারে। আমার মূল্যায়ন, দিক ঠিক আছে, কিন্তু মাত্রা সমস্যার তুলনায় ছোট।
সংকট কাটানোর চাবিকাঠি কোথায়
সংকটের মূল কারণ কী, টাকার জোগান, চাহিদা, নাকি আস্থা? আমার মতামত হলো, টাকার জোগান নয়। ব্যাংকে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি অলস তারল্য থাকাই তার প্রমাণ। বাধা মূলত দুই ভরসার। একটি ব্যাংকের ওপর আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতার ভরসা, আরেকটি বাজার আর জ্বালানির ওপর উদ্যোক্তার ভরসা।
সুদের চড়া হার এই দুই বাধার পাশে তৃতীয় এবং সত্যিকারের বাধা, তবে একমাত্র নয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সিএমএসএমই খাত। সমাধানের পথ আমি চারটি দেখি।
প্রথমত, খেলাপি ঋণ আদায় আর দুর্বল ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন স্বচ্ছভাবে করতে হবে, পুনঃতফসিল দিয়ে সংখ্যা সাজিয়ে নয়।
দ্বিতীয়ত, শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি প্রতিবেদনে দৈনিক চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ ২ হাজার ৬৭০, ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ।
তৃতীয়ত, পুনঃঅর্থায়ন ও ঋণ নিশ্চয়তার সুবিধা সহজ কাগজপত্রে ছোটদের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং মাসওয়ারি বিতরণ ও কর্মসংস্থানের তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে সুবিধা আসলে কোথায় যাচ্ছে বোঝা যায়।
চতুর্থত, সরকারের ব্যাংকঋণ সংযত রাখতে হবে, সুদের ব্যবধানের সীমা ধাপে ধাপে কার্যকর করতে হবে, আর মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে তাল রেখে নীতি সুদহার কমাতে হবে। সুদ কমানো জরুরি, কিন্তু ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর মতো পরিবেশ ফিরিয়ে না আনলে অবস্থার উন্নতি হবে না।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

