জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আদেশের ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতার কারণে দেশের শিল্প খাতে চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার দুর্বলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এসব সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন আংশিকভাবে চলছে, আবার কিছু কারখানা বন্ধ রয়েছে। বিক্রি কমে যাওয়া এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য।
বাংলাদেশ শিল্প ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়া, উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া এবং আবাসন খাতের ধীরগতিতে ইস্পাত, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যের চাহিদা কমেছে। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের বাড়তি খরচের মুখে রয়েছে।
কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হলেও তা সর্বত্র সমান নয়। ব্যবসায়ীদের মতে, সাময়িক উন্নতির পর আবার সংকট দেখা দিলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। পাশাপাশি চলতি মূলধনের অভাব, ঋণপত্র খোলা এবং বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহের সমস্যাও শিল্প কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। পোশাক কারখানাগুলো ক্রয়াদেশ ও অনুসন্ধান পেলেও শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে বিরোধসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে ক্রেতারা মনে করছেন।
তাঁর হিসাবে, দেশের অনেক কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। ইস্পাত ও সিমেন্ট খাতের পরিস্থিতি আরও কঠিন। এসব খাতের কিছু কারখানা বন্ধ রয়েছে, আবার কোনো কোনোটি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।
পারভেজ আরও বলেন, ভোক্তাদের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ কম থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসা, কুটিরশিল্প ও খুচরা বিক্রেতারাও সমস্যায় পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন বলে তাঁর দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সংগঠনটি জানিয়েছে, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর কোনোটিই জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ হয়নি। একই সময়ে ৫৩টি কারখানা চালু হয়েছে, পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে অথবা সংগঠনের সদস্যপদ পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৪ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। ফলে বস্ত্রকলগুলোকে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অর্থায়নসংক্রান্ত সমস্যাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তাঁর অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতা ও চাঁদাবাজির কারণে পণ্য পরিবহন এবং নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাসেলের মতে, পুঁজিবাজারে অর্থের ঘাটতির পাশাপাশি আস্থার সংকটও রয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন সহজে মূলধন সংগ্রহ করতে পারছে না, তখন সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি উপকরণে অর্থ চলে যাওয়ায় বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। তাই রপ্তানিমুখী শিল্পের পাশাপাশি যেসব দেশীয় প্রতিষ্ঠান আমদানির বিকল্প পণ্য উৎপাদন করে, সেগুলোকেও নীতিগত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও অর্থায়নসংক্রান্ত সমস্যায় দুই শতাধিক বস্ত্রকল এখনো বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, পোশাক প্রস্তুতকারকদের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাতজনিত বিঘ্নের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যবাহী কনটেইনারের পরিবহন খরচ আগের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় পরবর্তী মৌসুমের জন্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ক্রয়াদেশ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ইস্পাত প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী জানান, কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ বেড়েছে। আগে যেখানে গ্যাসের চাপ পাওয়া যেত না, সেখানে এখন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ চাপ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি এখনো দুর্বল।
তিনি বলেন, ইস্পাত খাতের চাহিদার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে সরকারি খরচ থেকে। সরকারি ব্যয় স্থবির হয়ে পড়া, আবাসন খাতে সীমিত কার্যক্রম এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নের গতি কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে।
গ্যাস সংকট ও অন্যান্য সমস্যায় আট থেকে দশটি ইস্পাতকল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বছরে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন এ খাতের উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি কমেছে। উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংকঋণ নেওয়া কঠিন হচ্ছে, আর ডলারের ঘাটতিতে আমদানি করা কাঁচামালের জন্য ঋণপত্র খুলতেও সমস্যা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সুদের হার কমানো, সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে সহায়তা এবং ইস্পাত খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ সিরামিক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সরবরাহে উন্নতি সীমিত এবং অসম। অনেক কারখানা বন্ধ রয়েছে অথবা সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করে চলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্থরতা, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি ও নতুন অর্ডার পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
আকিজ প্লাস্টিকসের উপব্যবস্থাপক সাইফুল হাসান জানান, গ্যাসের ঘাটতিতে উৎপাদন পিছিয়ে যাচ্ছে এবং পণ্য পাঠানোর সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে। এতে আগাম সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ক্রেতাদের কাছে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি শিল্পকারখানার জন্য পৃথক গ্যাস সরবরাহ নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও যথাযথ নীতিগত সহায়তা ছাড়া উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন।
ব্যবসায়ীদের মতে, শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো, অর্থায়নের বাধা কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে বিনিয়োগের গতি, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান আরও চাপে পড়তে পারে।

