বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে মজুরি নিয়ে অসন্তোষ নতুন নয়। সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের প্রায় তিন বছর পর আবারও রাজপথে নেমেছেন শ্রমিকদের একটি অংশ। তাঁদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, বর্তমান আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো শ্রমিককে অতিরিক্ত সময়সহ দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে মাসে ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতে হচ্ছে। এরপরও বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
কয়েক বছর আগে যে বাসার ভাড়া ছিল মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা, তা বেড়ে এখন প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক শ্রমিক প্রতিনিধি। চলতি মাসে উত্তরার শ্রমিকেরা ৩০ হাজার টাকা মজুরি এবং বকেয়া পরিশোধের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হন, তাঁদের মধ্যে ১৮ জন পুলিশ সদস্য। বিক্ষোভকারী শরিফা বেগম বলেছিলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে হবে, নয়তো মজুরি বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা জীবনধারণের খরচ মেটাতে পারেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে শ্রমিকদের একটি অংশের বর্তমান ৩০ হাজার টাকার দাবিটি মূল বেতনের জন্য, আর ১২ হাজার ৫০০ টাকা হলো মোট ন্যূনতম মজুরি। ফলে দুটি অঙ্ক সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে এবং ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে।
শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, সংসারের খরচ মেটাতে অনেক শ্রমিককে অতিরিক্ত কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে কর্মঘণ্টা এবং শ্রম আইন মেনে চলার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। শ্রম অধিকারকর্মী কল্পনা আক্তারের মতে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি ন্যূনতম মজুরি ও জীবনধারণের উপযোগী মজুরির পার্থক্যও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার মধ্যেই একজন শ্রমিকের সম্মানজনক জীবনযাপনের খরচ মেটানোর মতো আয় থাকা উচিত; অতিরিক্ত সময় কাজের ওপর নির্ভর করে নয়। এ জন্য সরকারের সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি, কারখানার মালিকদের তা বাস্তবায়ন এবং অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তবে মজুরি বাড়ানোর অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে মালিকপক্ষ ও শ্রম অধিকারকর্মীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ডিবিএল গ্রুপের এম এ জব্বার স্বীকার করেছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে। কিন্তু কাঁচামাল ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আদেশ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন করে মজুরি বাড়ানোর খরচ বহন করা কঠিন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্য, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্যের দাম বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরছেন উৎপাদকরা। ক্রেতারা শ্রম অধিকার ও টেকসই উৎপাদনের কঠোর মানদণ্ড দাবি করার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং ছাড় দেওয়ার চাপও দেন। জব্বারের প্রশ্ন, প্রতি পোশাকে মাত্র পাঁচ বা দশ মার্কিন সেন্ট বেশি দিয়ে ক্রেতারা কি বাড়তি মজুরির ব্যয়ে সহায়তা করতে পারেন না?
ফকির ফ্যাশনের ফকির কামরুজ্জামান নাহিদও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি সমন্বয়কে সমর্থন করেছেন। তবে চলমান দাবির পরিমাণ এবং নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রস্তুতির মধ্যে ধারাবাহিক বিক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র; ইতিমধ্যে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর ক্ষমতা দুর্বল। বিশেষ করে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না হলে দর-কষাকষির অবস্থান আরও নাজুক হয়। তাঁর মতে, নকশা, গবেষণা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও বিপণনে বিনিয়োগ বাড়ালে রপ্তানিকারকেরা ভালো দাম আদায়ে সক্ষম হতে পারেন।
কল্পনা আক্তারের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে অতিরিক্ত দর-কষাকষির ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন উৎপাদকেরাই। ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা দেখিয়ে শ্রমিকদের মজুরির দাবি অনির্দিষ্টকাল উপেক্ষা করা যায় না।
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও ক্রেতাদের মূল্য পরিশোধের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০১৬ সালের এক জরিপে বাংলাদেশের সরবরাহকারীরা জানিয়েছিলেন, তাঁদের মাত্র ১৭ শতাংশ ক্রেতা ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করতে রাজি ছিলেন। জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে মজুরি বৃদ্ধির খরচ মেটাতে দাম সমন্বয়ের জন্য সরবরাহকারীদের গড়ে ১২ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
স্টিচ-ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের পর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরে জরিপ করা ৬৭ শতাংশ কারখানা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কাছ থেকে কোনো মূল্যবৃদ্ধি পায়নি। যেসব কারখানা বাড়তি দাম পেয়েছিল, সেখানেও তা উৎপাদন ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপ পুরোপুরি মেটাতে পারেনি। অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতি পোশাকে সাত সেন্ট দাম বাড়ানো হলে উৎপাদকের মুনাফার হার না কমিয়েই প্রস্তাবিত ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা ন্যূনতম মজুরি দেওয়া সম্ভব হতো।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বক্তব্যে অবশ্য ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টারের সংগ্রহ করা জবাবে ১০টি ব্র্যান্ডের মধ্যে ৯টি জানিয়েছিল, উচ্চতর মজুরির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা ক্রয়মূল্য সমন্বয় করেছে। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, নেক্সট ও বেস্টসেলার তাদের মূল্য নির্ধারণে মজুরির ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছিল। তবে এসব বক্তব্যে ক্রেতারা বাস্তবে বাড়তি মজুরি ব্যয়ের কতটা বহন করেছে, তা স্পষ্ট হয়নি।
মজুরি নির্ধারণের পর তা বাস্তবায়নও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের শ্রমিক অসন্তোষের পর শ্রমিক, মালিক ও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে ১৮ দফা বিষয়ে সমঝোতা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে সরকার নিয়মিত ৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধির অতিরিক্ত আরও ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট অনুমোদন করে। কিন্তু আগের ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে অসামঞ্জস্য ছিল। স্টিচ কনসোর্টিয়াম ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অন্তর্ভুক্ত ৩৮৫টি কারখানার ৩২ শতাংশ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশোধিত মজুরি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। নমুনায় থাকা সব অননুগত কারখানাই ইপিজেডের বাইরে ছিল।
অন্যদিকে, শ্রম মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের নভেম্বরে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৯৯ শতাংশের বেশি কারখানায় সংশোধিত মজুরি বাস্তবায়িত হয়েছে। দুটি গবেষণার নমুনা ও সময়কাল এক নয়, তাই ফলাফল সরাসরি তুলনা করা যায় না। তবে বিজিএমইএর বাইরের কারখানাসহ পুরো শিল্পে মজুরি বাস্তবায়নের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি মূল্যায়ন এবং নতুন করে পর্যালোচনা প্রয়োজন কি না, তা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার কথা থাকলেও এর ফলাফল স্পষ্ট নয়। ২০২৬ সালে শ্রম আইন সংশোধন করে ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার ব্যবধান পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। এখন নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মনোনয়ন চেয়েছে সরকার। ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কমিটি গঠিত হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
কল্পনা আক্তার যেখানে শ্রমিকদের জন্য দ্রুত ও সুস্পষ্ট সহায়তার সময়সূচি চান, সেখানে কামরুজ্জামান আলোচনার প্রক্রিয়াকে এগোতে দেওয়ার পক্ষে। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও মালিকদের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বাড়তি ব্যয়ের জোগান কীভাবে আসবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
তবে পোশাকশিল্পের সব অস্থিরতার কারণ ন্যূনতম মজুরি নয়। বেতন বকেয়া, শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধের মতো সমস্যার আলাদা কারণ রয়েছে, যা শুধু মজুরি কাঠামো সংশোধন করে সমাধান করা সম্ভব নয়।
নতুন মজুরি আলোচনা শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে বোর্ড হয়তো বিরোধ নিষ্পত্তির পথ তৈরি করবে। কিন্তু মূল প্রশ্ন দুটি থেকেই যাচ্ছে—সম্মত মজুরি কি শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের হাতে পৌঁছাবে, আর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো দাম আদায় করতে না পারলে উৎপাদকেরা সেই ব্যয় বহন করতে পারবেন কি না?

