বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন যে গতিতে বাড়ছে, তার তুলনায় অর্থের সরবরাহ বাড়ছে দ্রুত। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতার কারণে অর্থের এই বাড়তি প্রবাহ মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি ও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সম্পর্ক আগের তুলনায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
২৩ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশে। অর্থের সরবরাহ বাড়লেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলেও সেই অর্থের বড় অংশ উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে না। ফলে নতুন পণ্য ও সেবার উৎপাদন যথেষ্ট না বাড়ায় বাজারে বাড়তি অর্থের চাপ শেষ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিতে প্রচলিত নগদ টাকা, চলতি হিসাবের আমানত এবং স্বল্পমেয়াদি সঞ্চয় ও মেয়াদি আমানতসহ বিভিন্ন উপাদান নিয়ে ব্যাপক অর্থ সরবরাহের হিসাব করা হয়। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি এম২ নামে পরিচিত।
সাধারণভাবে অর্থের সরবরাহ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি আসতে পারে। তবে পণ্য ও সেবার উৎপাদন না বাড়িয়ে অর্থের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে একই পরিমাণ পণ্য কেনার জন্য মানুষের হাতে বেশি টাকা জমা হয়। এতে চাহিদা বাড়ে এবং সরবরাহ সীমিত থাকলে পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আগের কয়েক বছরে অর্থের সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কম স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির কারণে অর্থের সরবরাহের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধির উৎস ও ধরনে পরিবর্তন এসেছে, যা মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধির পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও বৈদেশিক সম্পদ—দুই ধরনের উপাদানই ভূমিকা রেখেছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ ঋণ বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশের বেশি ছিল।
তবে সরকারের নেওয়া ঋণের বড় অংশ ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের মতো চলতি ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম বিনিয়োগে এসব অর্থের তুলনামূলক কম ব্যবহার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের প্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিতে সরকারি ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও উৎপাদন যদি একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন। বরং উৎপাদন সীমিত থাকা অবস্থায় বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ পণ্য ও সেবার দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধির আরেকটি উৎস হলো বৈদেশিক খাত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কেনার কার্যক্রম অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থের জোগান দিয়েছে।
প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সেই অর্থের প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন ও বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনীতিতে তার প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আগের তুলনায় কম সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধিতে তার অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকছে।
উৎপাদন খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা দূর করা না গেলে অতিরিক্ত অর্থের জোগান মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর বদলে তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের সময়কালের সঙ্গে পরবর্তী বছরগুলোর তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থের সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ধারাবাহিক কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ছিল। এ সময় অর্থের সরবরাহের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকে।
বিশ্বব্যাংক অবশ্য ওই সময়ের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে শুধু অর্থের সরবরাহকে দায়ী করেনি। জ্বালানির দামে বড় ধরনের বৃদ্ধি এবং দেশীয় মুদ্রার উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়নের মতো সরবরাহপক্ষীয় কারণও মূল্যস্ফীতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি একটি একক কারণে তৈরি হয়নি। অর্থের সরবরাহ, উৎপাদনের গতি, জ্বালানির দাম, বিনিময় হার এবং বাজারে পণ্য সরবরাহের পরিস্থিতি—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব এতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। শুধু অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করলেই মূল্যস্ফীতির স্থায়ী সমাধান হবে না; একই সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করাও প্রয়োজন।
সরকারি ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বেশি ব্যবহার করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা গেলে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সম্প্রসারণে আরও সক্ষম হবে।
সব মিলিয়ে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি তখনই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, যখন তার সঙ্গে উৎপাদন ও বিনিয়োগেরও সমানতালে অগ্রগতি ঘটে। অন্যথায় অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করতে পারে, যার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের।

