দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ জন্য ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কূপ দুটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এতে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ‘তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খনন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করার কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তবে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে কি না, তা এ তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের অর্থায়ন ও ব্যয়
প্রস্তাবিত ৫৯২ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৩২ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হয়। এরপর প্রস্তাবিত ব্যয় ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগ করে কূপ খনন, দেশি ও বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ করা হবে। ২০২৬ সালে অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানি প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, নতুন দুটি কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের পাশাপাশি প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। কূপ দুটি উৎপাদনে এলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ বাড়বে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির প্রয়োজন কমানোর ক্ষেত্রেও সহায়তা মিলতে পারে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান কূপমুখের দাম অনুযায়ী, সম্ভাব্য উৎপাদিত গ্যাস ও কনডেনসেটের মোট মূল্য ধরা হয়েছে ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের দাম বিবেচনায় নিলে শুধু গ্যাসের সম্ভাব্য মূল্য ১০ বছরে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা হতে পারে।
তবে কূপ দুটি থেকে প্রকৃত উৎপাদন কত হবে এবং প্রকল্পের বিনিয়োগের বিপরীতে কী পরিমাণ আর্থিক সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে খননের ফলাফল, উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ব্যয়ের ওপর।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের ছয়টি পরিচালনাধীন গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র তিতাস থেকে ২৮টি খনন করা কূপের মধ্যে ২৩টি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।
নতুন কূপ খননের পরিকল্পনাটি এসেছে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সংগৃহীত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনার পর। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি চীনের জাতীয় পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অধীন প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে এসব তথ্য পর্যালোচনার দায়িত্ব দিয়েছিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ১৬টি বিদ্যমান এলাকার ভেতরে নতুন কূপ এবং সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে।
দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ৩০০ কূপ খননের লক্ষ্য
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নিয়েছে। এর পর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই ধাপে মোট ৩০০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, তিতাসের নতুন কূপ দুটি দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে, শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে নতুন কূপ খননের পাশাপাশি বিদ্যমান কূপগুলোর উৎপাদন ধরে রাখা, অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণও জরুরি।
সব মিলিয়ে, তিতাসে ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের একটি অংশ। প্রকল্পটি অনুমোদন ও সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে নতুন সংযোজন হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কূপ দুটি থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন এবং নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার ওপর।

