রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক শাখায় বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর, নগদ ঘাটতি এবং গ্রাহকের লকার থেকে স্বর্ণালংকার হারানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখায় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, পাবনা ও চাঁদপুরের শাখায়ও কোটি টাকার অর্থের গরমিলের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলা এবং তদন্তের তথ্য পাওয়া গেছে। বারবার এমন ঘটনা সামনে আসায় শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নয়, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, লেনদেনের অনুমোদন এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সৈয়দপুর শাখার ঘটনা সবচেয়ে বড় অঙ্কের। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলিমুল আল রাজি তমালের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের পরিচয়পত্র ও গোপন সংকেত ব্যবহার করে নিজের এবং কয়েকটি সন্দেহজনক হিসাবে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। নিরীক্ষায় আরও কয়েকটি হিসাবের মাধ্যমে অর্থ সরানোর তথ্য উঠে এসেছে। নিলুফার আক্তার ও রোদেলা আক্তারের নামে খোলা দুটি হিসাবে আরটিজিএসের মাধ্যমে যথাক্রমে ৭ কোটি ২৭ লাখ ও ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হিসাবের পরিচয়সংক্রান্ত নথি ও ব্যাংকের সংরক্ষিত তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকার কথাও বলা হয়েছে। তমালের নিজের হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা এবং তাঁর ছেলের নামে খোলা একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা স্থানান্তরের তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে নিরীক্ষায় উঠে আসা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
ঘটনাটিতে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও। দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকলে লেনদেনের অনুমোদন, পরিচয় যাচাই, হিসাব পর্যবেক্ষণ এবং দৈনিক হিসাব মেলানোর প্রক্রিয়ায় তা ধরা পড়ল না কেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তমালকে কর্মস্থলে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর সন্ধানে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কয়েকজন সহকর্মী ও স্বজনের দাবি, তিনি পরিবার নিয়ে দুবাইয়ে রয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের রংপুর কার্যালয়কে জানিয়েছে এবং মামলা করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব তথ্যের স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামের লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখায়ও বড় অঙ্কের নগদ ঘাটতির ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শাখার ভল্টে হিসাবের তুলনায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা কম পাওয়া যায়। এ ঘটনায় শাখার ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্যাংকের অভিযোগ অনুযায়ী, ভল্টে টাকার প্রকৃত পরিমাণ আড়াল করতে বড় মূল্যমানের নোটের বান্ডিলে ছোট মূল্যমানের নোট রাখা হয়েছিল। ওই অর্থ কোথায় গেছে এবং লেনদেনের সঙ্গে আর কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। অন্যদিকে পাবনার কাশিনাথপুর শাখায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১০ কোটি ১৩ লাখ ৬২ হাজার টাকার হিসাবের গরমিল ধরা পড়ে। এ ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপকসহ তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একই বছরের আগস্টে চাঁদপুরের ছেংগারচর বাজার শাখার ভল্টে ৭৫ লাখ ২০ হাজার টাকার ঘাটতি ধরা পড়ার পর ক্যাশ কর্মকর্তা দীপংকর ঘোষের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব ঘটনায় অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য পাওয়া গেলেও প্রতিটি মামলার বর্তমান অগ্রগতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
শাখার নগদ অর্থের বাইরেও গ্রাহকের সম্পদ সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৪ সালে অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকার রমনা করপোরেট শাখার একটি লকার থেকে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার হারানোর অভিযোগ করেন কানাডাপ্রবাসী এক নারী। তাঁর দাবি, জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া ঘোষণাপত্র ব্যবহার করে লকার পরিচালনার মাধ্যমে স্বর্ণালংকার সরানো হয়েছে। এ ঘটনায় আদালতে মামলাও হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে শাখার ভল্ট ও হিসাবের নিরাপত্তার পাশাপাশি লকার পরিচালনার অনুমোদন, স্বাক্ষর যাচাই এবং গ্রাহকের সম্পদ হস্তান্তরের নথিপত্র কতটা কার্যকরভাবে যাচাই করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্তে যারা দোষী প্রমাণিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকের অর্থ উদ্ধার করে ফেরত দেওয়াকে ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বক্তব্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৈয়দপুর শাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে পরিদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্য ঘটনাগুলোতে অগ্রণী ব্যাংকের নেওয়া ব্যবস্থার তথ্যও চাওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
একাধিক শাখায় এমন অভিযোগ সামনে আসার পর মূল প্রশ্নটি শুধু কত টাকা সরানো হয়েছে, তা নয়; এত বড় অঙ্কের অস্বাভাবিক লেনদেন বা নগদ ঘাটতি শনাক্ত করতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নিরীক্ষা, দায়িত্বের পৃথকীকরণ, উচ্চমূল্যের লেনদেনে স্বাধীন অনুমোদন, সন্দেহজনক হিসাব দ্রুত শনাক্ত করা এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মৌলিক অংশ। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কোথায় নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়েছে, তা চিহ্নিত করে সংশোধন না করলে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের অর্থ ও সম্পদ উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার এবং ব্যাংকের ওপর আস্থা বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

