রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট এখন বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক ভ্যাট আদায় করতে পেরেছে। এমনকি আদায়ের অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়েও কম। এক দশক ধরে এনবিআরের তিন অনুবিভাগের মধ্যে ভ্যাট ছিল রাজস্ব আহরণের প্রধান ভরসা। সেই খাতেই এখন ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির জন্য মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। প্রথম তিন মাসের জন্য ভ্যাটের লক্ষ্য ছিল ৫৬ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। কিন্তু ভ্যাট কমিশনারেটগুলো আদায় করেছে ২৮ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের প্রায় অর্ধেক।
গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এনবিআর ভ্যাট পেয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। সে তুলনায় এবার আদায় ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা কম। এর ফলে প্রবৃদ্ধি নেমে গেছে ঋণাত্মক ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশে। অর্থাৎ ভ্যাট আদায় বাড়া তো দূরের কথা, উল্টো কমে গেছে।
মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বৃহৎ করদাতা ইউনিট বা এলটিইউ ভ্যাটের। এই ইউনিটের তিন মাসের লক্ষ্য ছিল ৩২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের অর্ধেকেরও কম। ঘাটতি ১৯ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ইউনিট থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি এসেছিল।
অন্য বড় কমিশনারেটগুলোর চিত্রও ভালো নয়। চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটের লক্ষ্য ছিল ৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। ঘাটতি ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকা, আদায় ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। ঘাটতি ৯৭৮ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। বরিশাল ভ্যাট কমিশনারেটেও প্রায় একই চিত্র, সেখানে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কম ভ্যাট এসেছে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রেও আদায় কম হয়েছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভ্যাট আদায় বাড়বে।
ভ্যাটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন রিটার্ন জমার নিয়মে পরিবর্তনকে। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার নামে ভ্যাট রিটার্ন প্রতি মাসের বদলে তিন মাস অন্তর জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাঁদের মতে, এর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে ভ্যাট আদায়ে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য (ভ্যাট নীতি) ড. আব্দুর রউফ বলেন, গত এক যুগে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে। এ বছর মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে হিসাবে স্বাভাবিকভাবে আরও ৩ থেকে ৪ শতাংশ বেশি ভ্যাট আদায়ের কথা ছিল। অথচ প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ১৫ শতাংশের মতো। তাঁর মতে, এর মূল কারণ সমীক্ষা ছাড়াই ভ্যাট আহরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।
আব্দুর রউফ আরও ব্যাখ্যা করেন, তিন মাস অন্তর ভ্যাট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ব্যবসায়ীরা জুলাই ও আগস্টে রিটার্ন জমা দেননি। আগে প্রতি মাসে রিটার্ন জমা হতো বলে সরকার ঠিক সময়ে ভ্যাট পেত। এখন ব্যবসায়ীরা আগে কর্মীদের বেতন-ভাতা, ব্যাংকের কিস্তি ও সরবরাহকারীদের পাওনা মেটান। তিন মাস পর ভ্যাট দেওয়ার সময় আসতে আসতে আগের মতো অর্থ আর আসছে না। তাঁর বক্তব্য, রাজস্ব আহরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব দিক বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু রিটার্নের নিয়ম নয়, বর্তমান প্রশাসনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তদারকিও এর সঙ্গে জড়িত। অতীতের আন্দোলনের প্রভাবে এখনো অনেক কর্মকর্তার কাজে মনোযোগ ফেরেনি বলে তাঁরা জানান। হঠাৎ কমিশনার পরিবর্তন এবং সামান্য অজুহাতে বদলির অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, কিছু কর্মকর্তা কাস্টম হাউস থেকে বন্ড ভ্যাটে ঢাকার মধ্যেই পদায়ন নিচ্ছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ দিনের পর দিন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করছেন। নতুন প্রশাসন এলে কিছু কর্মকর্তা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলেও অভিযোগ আছে। এই বৈষম্য ভ্যাট আদায়ের গতি কমিয়ে দিয়েছে বলে তাঁদের মত।
এই চিত্র সামগ্রিক রাজস্ব পরিস্থিতির সঙ্গেও মেলে। ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি বাড়লে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ে, কারণ বাজেটের ব্যয় মেটাতে বাড়তি ঋণ নিতে হয়। ফলে ভ্যাটের এই পতন শুধু এনবিআরের নয়, পুরো অর্থব্যবস্থার জন্যই চাপের বার্তা।
সব মিলিয়ে এনবিআরের সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার নতুন ব্যবস্থার প্রভাব মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকি শক্তিশালী করা। ডিসেম্বরের মধ্যে আদায় বাড়ার যে আশা কর্মকর্তারা দিচ্ছেন, তা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

