খবরের কাগজের প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই বাড়তি দামের কারণে ২৩ দিনে ভোক্তাদের পকেট থেকে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত চলে গেছে। আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট দীর্ঘ হচ্ছে। তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কেউ কেউ বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি দাম বাড়লেও সংকট কাটেনি
গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
দাম সমন্বয়ের পর বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সংকট কাটেনি। বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
এদিকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তারপরও বাজারে স্বস্তি ফেরেনি বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
প্রতিদিন বাড়তি আদায়ের অভিযোগ ১৬ কোটি টাকার বেশি
দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ৪ হাজার ৩৩৩ টন গ্যাস। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ১২ কেজির প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার সিলিন্ডার বিক্রি হয়।
প্রতি সিলিন্ডারে গড়ে ৪৬৩ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হলে এক দিনে বাড়তি আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এই হিসাবে ২৩ দিনে অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ প্রায় ৩৮৪ কোটি টাকা, যা প্রতিবেদনে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হিসাব বাজারে বিক্রির আনুমানিক পরিমাণ ও গড় বাড়তি দামের ভিত্তিতে করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারণে বিক্রির তথ্য ও বাজারদর যাচাই করা প্রয়োজন।
চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না বিক্রেতারাও
আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে পারছে না। ফলে আমদানি ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় খুচরা বিক্রেতাদেরও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
রাজধানীর পান্থপথ এলাকার আশা এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা মো. সবুজ জানান, দাম বাড়ানোর পরও চাহিদামতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন পরিবেশকের কাছে ঘুরে অল্পসংখ্যক সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
একই এলাকার অ্যাসেনশিয়াল গ্যাস কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. আলী আসগরও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ ও মিরপুরের মতো এলাকায় দাম আরও বেশি বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। তাঁদের দাবি, অনেক জায়গায় ২ হাজার ৩০০ টাকার কমে ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, কয়েক মাস ধরেই তাঁকে ২ হাজার টাকার বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সরকার দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও তিনি ২ হাজার ৪০০ টাকার কমে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
পরিবেশকদের সরবরাহও কমেছে
কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন এলপিজি কোম্পানির পরিবেশক মেসার্স জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল হক জানান, চলতি বছরজুড়েই গ্যাসের সংকট চলছে। সরকার দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করেছিলেন, কিন্তু কোম্পানিগুলো এখনো চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, আগে যেখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি সিলিন্ডার বিক্রি করতেন, এখন সেখানে ৭০ থেকে ১০০টিও সংগ্রহ করতে পারছেন না। যা পাওয়া যাচ্ছে, তা-ও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে।
মিরপুরের কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরবরাহ কম থাকায় পরিবেশকদের কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
সংকট নিরসনে সরবরাহ ও বাজার তদারকি জরুরি
এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হলেও বাজারে সেই দামে পণ্য না পাওয়ায় সাধারণ পরিবারের ব্যয় বাড়ছে। রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন বাজেটে চাপ তৈরি করছে।
বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরবরাহব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা, আমদানি ও পরিবেশক পর্যায়ে গ্যাসের প্রাপ্যতা যাচাই এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সরবরাহের ঘাটতি দূর না হলে এবং বাজারে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি মূল্য নির্ধারণের সুফল সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।

