নতুন বছর যত এগিয়ে আসছে, বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রশ্নটা ততই জরুরি হয়ে উঠছে: ২০২৭ সালে টাকা কোথায় রাখলে মূলধন নিরাপদ থাকবে, আবার কিছু আয়ও হবে? অর্থনীতির গতি ধীর, মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, আবার সুদহার ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। এই পরিস্থিতিতে আমানত, সোনা, শেয়ারবাজার ও শিল্প খাতের প্রতিটি পথের সুবিধা-অসুবিধা আলাদা।এই বাস্তবতায় বিনিয়োগের প্রতিটি পথ কতটা নিরাপদ আর কতটা আয় দিতে পারে, তা তথ্য ধরে ধরে দেখা যাক।
ধীর গতির অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতির শঙ্কা
বিনিয়োগের পরিবেশ বোঝার জন্য আগে অর্থনীতির গতিটা দেখা দরকার। আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশ করেছে। পূর্বাভাস সত্যি হলে এটি ৩৮ বছরে সবচেয়ে দুর্বল অর্থবছর হবে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ৩.৪ শতাংশ, এডিবির ৪ শতাংশ। আইএমএফ একই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ হতে পারে বলেও জানিয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ছবিটা কিছুটা ভিন্ন। তাদের তথ্যে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশ, যা ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঝুঁকি কাটেনি বলে মনে করছে। নতুন বেতন কাঠামো ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশ, এসএলএফ ১১ শতাংশ ও এসডিএফ ৭.৫ শতাংশ।
ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্র: মূলধন নিরাপদ, প্রকৃত আয় কম
নিরাপদ বিনিয়োগ বলতে অনেকেই এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র বোঝেন। সেখানে সমস্যা প্রকৃত আয়। মে মাসে ব্যাংক খাতের গড় আমানত সুদ ছিল ৬.২২ শতাংশ, যেখানে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮ শতাংশ।
একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক এক বছরের এফডিআরে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের ৮.৩৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তুলনা করলে এই হারও প্রায় ০.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট নিচে।
ব্যাংক খাতের অবস্থাও বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। মার্চে এই হার ছিল ৩২.২৬ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। জুন শেষে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের বকেয়া ঋণ ৬ লাখ ৮১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের চেয়েও বেশি।
সোনা: সুরক্ষা আছে, অস্থিরতাও আছে
সোনা অনেকের কাছে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা। কিন্তু দেশের বাজারে দাম খুব ওঠানামা করেছে। বাজুস একসময় ভরিপ্রতি দাম ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৬ টাকা নির্ধারণ করেছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২৬ সেপ্টেম্বর ২২ ক্যারেট সোনার দাম কমিয়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারেও একই চিত্র। একটি সংকলন অনুযায়ী ২০২৬ সালের শুরুতে সোনা আউন্সপ্রতি ৫,৫০০ ডলার ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়ে, পরে তীব্র পড়ে। ২০২৭ নিয়ে বড় ব্যাংকগুলোর পূর্বাভাস একমত নয়। ২০২৭ সালের শেষে এইচএসবিসির লক্ষ্য প্রায় ৫,০২৫ ডলার, গোল্ডম্যান স্যাক্স ও ইউবিএসের ৫,৪০০ ডলার।
এই ফারাকের মূলে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনা ও মার্কিন সুদহারের গতি নিয়ে ভিন্ন অনুমান। গোল্ডম্যান স্যাক্স ২০২৭ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মাসে প্রায় ৪০ টন সোনা কেনার অনুমান ধরেছে। তাদের ধারণা, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ তিন দফা সুদ কমাবে। ডলার শক্তিশালী হলে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনা কমলে দাম চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ সরাসরি বড় সোনা আমদানিকারক না হলেও দেশের বাজারের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে জড়িত। বাজুস আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও স্থানীয় তেজাবি স্বর্ণের মূল্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে দাম ঠিক করে, তাই কোনোটিতে পরিবর্তন এলে দেশের দামও সমন্বয় হয়। তাই ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারের গতির পাশাপাশি ডলারের দরের দিকেও নজর রাখা দরকার। সোনা সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না। লাভ-লোকসান পুরোপুরি দামের গতির ওপর নির্ভর করে।
শেয়ারবাজার: সস্তা মূল্যায়ন, তবে জ্বালানির ঝুঁকি
শেয়ারবাজারে মূল্যায়নের দিক থেকে সুযোগ দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ২৯ অক্টোবর ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৪১৭ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে। বাজারের সার্বিক মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) ৯ পয়েন্টের নিচে নেমেছে।
ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে এই অনুপাত ৬-এর মধ্যে, যে কারণে এ দুই খাতকে তুলনামূলক নিরাপদ বলা হচ্ছে। এ বছর ১০২টি কোম্পানি মোট ৪ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যা নগদ আয়ের একটি ভিত্তি দেয়। তবে সতর্কতাও আছে। ডিএসইর এক পরিচালক বলেছেন, শুধু পিই দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, মৌলভিত্তিও যাচাই করতে হবে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের উদ্বেগে ডিএসইএক্সে বড় পতন হয়েছিল। তাই জ্বালানি পরিস্থিতি শেয়ারবাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি। নীতিগত দিকে ডিবিএ ২০৩০ সাল পর্যন্ত শেয়ারবাজারের মুনাফায় কর অব্যাহতি চেয়েছে। সিদ্ধান্ত কোন দিকে যায়, তা ২০২৭ সালে বাজারের গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
শিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগ: ঋণ ও গ্যাসে আটকে গতি
শিল্প ও সরাসরি বিনিয়োগে চিত্র দুর্বল। ডিসিসিআইয়ের তথ্যে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫.৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা মাত্র ৫ শতাংশ। জুলাই-সেপ্টেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নতুন ঋণপত্র খোলা ৩.৫৮ শতাংশ কমে ৫১৫ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
এপ্রিল-জুনে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, আগের বছরের একই সময়ের ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলারের চেয়ে কম। নিট এফডিআই বাড়লেও তার বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে। জুন প্রান্তিকের নিট এফডিআইয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই এসেছে এভাবে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে আছে।
জ্বালানি সরবরাহই এখানে বড় প্রশ্ন। পেট্রোবাংলার হিসাবে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেপ্টেম্বরের শুরুতে দৈনিক ঘাটতি ছিল এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। সংকটের সময় ডিসিসিআই সভাপতি বলেছিলেন, জ্বালানি সংকটে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
ফ্ল্যাট বা জমিতে বিনিয়োগ
বিনিয়োগের জন্য ফ্ল্যাট বা জমি কেনা এখন আগের মতো সহজ হিসাব নয়। আবাসন খাত মন্দায়: অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে একজন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন, ঢাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। কেনার খরচও বেশি।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ দাবি, ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধনে ১৩ শতাংশের বেশি ব্যয় হচ্ছে, ফলে কিনে অল্প সময়ে বেচে লাভ করা কঠিন। তাই নিজের টাকায় অন্তত কয়েক বছর ধরে রাখার সামর্থ্য আছে কি না, সেটা আগে দেখা দরকার।
ঋণ নিয়ে কিনলে ঝুঁকি আরও বাড়ে, কারণ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণের কিস্তি দিতে অনেকে হিমশিম খাচ্ছেন। নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটে আলাদা ঝুঁকি আছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিক ও ডেভেলপারদের চুক্তি বাতিল হচ্ছে এবং পুরোনো অনেক প্রকল্পের কাজেও গতি নেই।
২০২৭ সালে যা নির্ধারণ করবে গতিপথ
২০২৭ সালে বিনিয়োগ করা ভালো হবে কি না, তার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর। বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার জরুরি। আইএমএফও সতর্ক করেছে, সংস্কার না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি প্রকৃতিও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।
তাই ২০২৭ সালের জন্য একক কোনো ‘সেরা’ বিনিয়োগ নেই। আমানত ও সঞ্চয়পত্র তুলনামূলক নিরাপদ হলেও প্রকৃত মুনাফা সীমিত। সোনা ও শেয়ারবাজারে সুযোগ আছে, তবে ঝুঁকিও রয়েছে। শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নির্ভর করবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ঋণপ্রবাহের ওপর। আর জমি বা ফ্ল্যাট দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে, তবে উচ্চ ব্যয় ও দ্রুত নগদে রূপান্তরের সীমাবদ্ধতা মাথায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, ২০২৭ সালে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঝুঁকি ও সময় দুই দিকই বিবেচনা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

