মজুরি বোর্ড বসেছে, কিন্তু কোনো শ্রমিকের হাতে এখনো এক টাকাও বাড়তি আসেনি। বুধবার সকালে ঢাকার সেগুনবাগিচায় তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বোর্ডের প্রথম বৈঠক শুরু হয়েছে। অথচ ঠিক তখনো মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া আর গাজীপুরের রাস্তায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। তাঁদের দাবি মাসে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা, যা বর্তমানের ১২ হাজার ৫০০ টাকার দ্বিগুণেরও বেশি। এই খবর শুধু একটি শিল্পের ভেতরের বিষয় নয়, কারণ দেশের মোট পণ্য রপ্তানির আশির শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। এখানে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, যাঁদের অর্ধেকের বেশি নারী। এর মধ্যে পরিস্থিতির মোড়ও কিছুটা ঘুরেছে; শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আক্তার জানিয়েছেন, বোর্ডের আগের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করায় সরকার গেজেট প্রকাশ করে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। লেখার সময় পর্যন্ত অবশ্য বৈঠকের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
বোর্ড কেবল সুপারিশ করতে পারে
আন্দোলন শুরু হয়েছিল গত শনিবার, ৩১ অক্টোবর। রোববার সরকার ছয় সদস্যের বোর্ড ঘোষণা করে এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তাতে সম্মতি দিলেও শ্রমিকেরা রাস্তা ছাড়েননি। বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, শুধু রোববারই প্রায় ৫২৯টি কারখানার কাজ ব্যাহত হয়েছে এবং প্রভাব পড়েছে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিকের ওপর। মঙ্গলবারেও তিন শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ ছিল, মিরপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং গাজীপুরে নামানো হয়েছে বিজিবি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী জরুরি বৈঠক করেছেন, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মালিকদের আশ্বাস দিয়েছেন আলোচনার মাধ্যমে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হবে। মালিকপক্ষও বকেয়া দ্রুত পরিশোধ এবং প্রতি মাসের সাত তারিখের মধ্যে বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কিছু কর্মকর্তা অবশ্য এই আন্দোলনের পেছনে বাইরের উসকানি থাকার অভিযোগ তুলেছেন। কোনো সংগঠিত ইন্ধন থাকলে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে আশা করছি, তবে শ্রমিকদের ক্ষোভের মূল ভিত্তি যে সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, তা আমরা একটু পরেই দেখব। একটি তুলনামূলক চিত্র দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে; আগের বোর্ডের প্রথম বৈঠক হয়েছিল সরকারি গেজেট প্রকাশের ৪৫ দিন পর, আর পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে লেগেছিল ছয় থেকে সাত মাস। অথচ এবার মাত্র তিন দিনের মধ্যে বোর্ড বসতে বাধ্য হয়েছে, যা থেকেই বোঝা যায় বর্তমান চাপটি কতখানি তীব্র। মনে রাখা দরকার, বোর্ড কেবল সুপারিশ করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত ঘোষণা দেয় সরকার। শ্রমিকপক্ষ চাইছে নতুন মজুরি যেন ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের বেতন থেকেই কার্যকর হয়। উল্লেখ্য, সম্প্রতি শ্রম আইন সংশোধন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের চক্র পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে, আর বর্তমান কাঠামোর তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে এই ডিসেম্বরেই।
ঘণ্টাপ্রতি মজুরি আধা ডলারেরও কম
১২ হাজার ৫০০ টাকার পুরো অঙ্কটিকে একটু ভেঙে দেখা যাক। আইনে দৈনিক আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ছয় দিন কাজ ধরলে মাসে মোট কর্মঘণ্টা দাঁড়ায় প্রায় ২০৮ ঘণ্টা। সে হিসাবে শ্রমিকের মজুরি দাঁড়ায় ঘণ্টায় মাত্র ৬০ টাকা, অর্থাৎ হাফ মার্কিন ডলারেরও কম। এটি আমার নিজের হিসাব, তবে অঙ্কটি বেশ সহজ। এই সামান্য টাকায় একজন অপারেটরকে ঘরভাড়া দিতে হয়, রান্নার গ্যাস কিনতে হয় এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক শ্রমিক জানিয়েছেন, তাঁর এক কক্ষের ঘরের ভাড়াই সাড়ে তিন হাজার টাকা। গ্যাসের সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাঁকে কাগজ পুড়িয়ে রান্না করতে হয়, আর আর্থিক সংকটে এ বছর তাঁর দুই সন্তানের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে। ওই শ্রমিকের মূল বেতন ১৫ হাজার টাকা এবং ওভারটাইমসহ তা ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় দাঁড়ায়।
এবার একটু পেছনের ইতিহাসের দিকে তাকাই। ২০০৬ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার ধাপে ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৬৬২ টাকা থেকে বেড়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিবারই মজুরি বেড়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ। শুনতে অনেক মনে হলেও, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তার আগেই বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের প্রতিবারই রাজপথে নামতে হয়েছে। গতবার শ্রমিকেরা ২৩ হাজার টাকা দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত পেয়েছিলেন ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা দাবির অর্ধেকের একটু বেশি। এই একই অনুপাত যদি এবারকার ৩০ হাজার টাকার দাবিতে খাটাই, তবে অঙ্কটি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ টাকা। আমি এটিকে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বলছি না; কেবল বলতে চাচ্ছি যে দরকষাকষির একটি পুরোনো ধারা রয়েছে। যেহেতু কিছু শ্রমিক সংগঠন ৩২ হাজার থেকে ৩৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করছে, তাই ৩০ হাজার টাকাটিকে চূড়ান্ত অঙ্ক না ধরে দরকষাকষির একটি প্রাথমিক অবস্থান হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত।
দাম বাড়ছে, কিন্তু বেতন কি সেই তুলনায় বাড়ছে?
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ; যার মধ্যে খাদ্যে ৭ দশমিক ২২ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি বছরের মে মাসে এই হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। অন্যদিকে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালের প্রায় ১১৩ ডলার মূল্যের ১২ হাজার ৫০০ টাকা এখন কমে প্রায় ১০১ ডলারে নেমেছে, অর্থাৎ ডলারের হিসাবে পতন ঘটেছে প্রায় ১০ শতাংশ। কেউ বলতে পারেন, প্রতি বছর তো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধির নিয়ম রয়েছে। ২০২৩ সালের কাঠামো অনুযায়ী প্রতিবছর মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে। আমি হিসাব করে দেখেছি, যিনি শুরুর গ্রেডে যোগ দিয়ে টানা দুই বছর একই কারখানায় কাজ করছেন, তাঁর মোট মজুরি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকায়, অর্থাৎ বেড়েছে মোটে আট শতাংশের মতো। অথচ এই একই সময়ে যদি মূল্যস্ফীতি বছরে গড়ে আট থেকে নয় শতাংশ ধরা হয়, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় এক চতুর্থাংশ। মানুষের আয় বেড়েছে সামান্য, আর পণ্যের দাম বেড়েছে অনেক বেশি; মূল সংকট বা ফাঁকটা তৈরি হয়েছে ঠিক এখানেই। বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এর পেছনে আরেকটি কারণের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পর বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মধ্যেও একই ধরনের বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যাকে তিনি ‘দেখাদেখি প্রভাব’ বলে অভিহিত করেছেন।
৩০ হাজার টাকার দাবির পেছনে কি বাস্তব ভিত্তি আছে?
এখানে আমরা আন্তর্জাতিক ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণের উপযোগী মজুরির ধারণাটি খতিয়ে দেখতে পারি। এর অর্থ হলো এমন একটি মজুরি, যা দিয়ে একজন পূর্ণ সময়ের শ্রমিক পরিবারের খাবার, ঘরভাড়া, চিকিৎসা এবং শিক্ষার মতো মৌলিক খরচে নিজের ন্যায্য অংশটুকু মেটাতে পারেন। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে পরিচিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি হলো অ্যাঙ্কার মেথড। গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরের জন্য এই অঙ্ক ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা এবং আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য ২৫ হাজার শিলিং বা ২৫ হাজার ১৬৬ টাকা। এই হিসাবটি ধরা হয়েছে চার সদস্যের একটি পরিবারে যেখানে গড়ে ১ দশমিক ৫৮ জন উপার্জন করেন।
এই মাপকাঠিতে বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ঢাকা শহরের মানদণ্ডের মাত্র ৪১ শতাংশ এবং শিল্পাঞ্চলের মানদণ্ডের প্রায় অর্ধেক। যেহেতু এই হিসাবটি ২০২৫ সালের, তাই এটিকে ২০২৬ সালের বর্তমান বাজারদরে রূপান্তর করলে আমার মোটামুটি হিসাব অনুযায়ী শিল্পাঞ্চলের অঙ্কটি ২৭ হাজারের কাছাকাছি এবং ঢাকা শহরের অঙ্কটি ৩৩ হাজার টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়। অর্থাৎ, ৩০ হাজার টাকার দাবিটি হুট করে আকাশ থেকে টুকে দেওয়া হয়নি, বরং এটি আন্তর্জাতিক মাপকাঠির খুব কাছাকাছিই রয়েছে।
অবশ্য আমাদের দেশের আইনও এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মজুরি বোর্ডকে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা এবং মালিকের আর্থিক সামর্থ্য; এই বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৩১ নম্বর কনভেনশনের তৃতীয় অনুচ্ছেদেও একই যুক্তির কথা বলা হয়েছে। একদিকে যেমন শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রাখতে হবে, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা, উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই কেবল প্রয়োজনের কথা ভেবে কিংবা শুধু মালিকের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে একপেশেভাবে কোনো অঙ্ক ঠিক করা সম্ভব নয়।
মজুরি বাড়লে কারখানাগুলো কি টিকতে পারবে?
এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের উদ্বেগগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। গত অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে স্থির ছিল, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কোনো প্রবৃদ্ধি দেখায়নি। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) দাবি অনুযায়ী, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ব্যাংকের চড়া সুদের হার এবং মজুরি সমন্বয়ের ফলে গত তিন বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে দেওয়া তথ্যে জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে অন্তত ৪০২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, একটি অধিকার সংস্থার মতে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৪৫৭ এবং এর ফলে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ হওয়ার মূল কারণ হিসেবে শ্রমিক অসন্তোষের চেয়ে বৈশ্বিক অর্ডারের সংকট এবং ব্যবসায়িক দেউলিয়াত্বকেই দায়ী করা হয়েছে।
তাহলে মজুরি বাড়ালে সামগ্রিক ঝুঁকি আসলে কতটা? শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হিসাব বলছে, মোট উৎপাদন খরচের মাত্র ১০ থেকে ১৩ শতাংশ ব্যয় হয় শ্রমিকের মজুরিতে, যা ২০২৩ সালে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল। সেবার ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়ানোর পর মালিকপক্ষ নিজেরাই জানিয়েছিলেন যে এর ফলে উৎপাদন খরচ বড়জোর ৫ থেকে ৬ শতাংশ বাড়তে পারে। এই অনুপাত যদি সত্য হয়, তবে মজুরি পুরো কাঠামোতে দ্বিগুণ হলেও মোট খরচ বৃদ্ধির কথা বড়জোর ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। অঙ্কটি ছোট নয় বটে, তবে শিল্পের পক্ষে একেবারে অসম্ভবও কিছু নয়।
ক্রেতাদের দিক থেকে বিচার করলে হিসাবটি আরও অনেক ছোট মনে হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ২০১০ সালে প্রকাশিত একাধিক গবেষণা উদ্ধৃত করে দেখিয়েছিলেন যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের খুচরা বিক্রয়মূল্যের মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ যায় শ্রমিকের মজুরিতে। সে হিসাবে মজুরি দ্বিগুণ হলেও পোশাকের দাম বাড়ার কথা বড়জোর ১ থেকে ৩ সেন্ট বা সামান্য কিছু। তার মানে দাঁড়ায়, ১০ ডলারের একটি টি-শার্টের ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ হতে পারে মাত্র ১০ থেকে ৩০ সেন্ট। তথ্যটি একটু পুরোনো হলেও এবং সেই দেশগুলোর মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি থাকায়, আমাদের দেশে এর প্রকৃত প্রভাব আরও অনেক কম হওয়ার কথা।
প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান
কম্বোডিয়ায় ২০২৬ সালে পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ছিল ২১০ ডলার, যা ২০২৭ সালের জন্য বাড়িয়ে ২১২ ডলার ঘোষণা করা হয়েছে। ভিয়েতনামের সবচেয়ে উন্নত অঞ্চলে মজুরি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ডং বা প্রায় ২০০ ডলারের কিছু বেশি, আর তুলনামূলক কম উন্নত অঞ্চলেও তা প্রায় ১৪০ ডলার। অন্যদিকে চীনের গুয়াংডং প্রদেশে এই মজুরি ২৮৬ থেকে ৩৭৮ ডলার পর্যন্ত। তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশের ১২ হাজার ৫০০ টাকা বা প্রায় ১০১ ডলারের মজুরি এই দেশগুলোর তুলনায় বেশ কম।
তবে মনে রাখতে হবে, কম মজুরি মানেই সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কম নয়, কারণ প্রকৃত হিসাবটি করতে হয় প্রতি শ্রমিকের মাথাপিছু উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা ছিল প্রতি ঘণ্টায় ৮ দশমিক ৭ ডলার, যেখানে ভিয়েতনামে তা ১২ দশমিক ৪ এবং ভারতে ১০ দশমিক ৭ ডলার। অবশ্য এই পরিসংখ্যানটি কেবল পোশাক খাতের নয়, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির গড় হিসাব; তাই একে একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা উচিত। তা সত্ত্বেও ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি এমন দাঁড়ায়; তাদের মজুরি আমাদের প্রায় দ্বিগুণ হলেও তাদের উৎপাদনশীলতা আমাদের চেয়ে মাত্র ৩০ শতাংশের মতো বেশি। এর মানে দাঁড়ায়, প্রতি এক টাকা মজুরির বিপরীতে আমরা এখনো প্রতিযোগিতায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি, যদিও সেই ব্যবধান বছর বছর কমে আসছে।
এখানে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী আর্থার লুইসের উদ্ধৃত তত্ত্বটি বেশ প্রাসঙ্গিক। গ্রামীণ জনপদ থেকে যদি প্রতিনিয়ত উদ্বৃত্ত শ্রমিক শহরে আসতে থাকেন, তবে কারখানাগুলো মজুরি না বাড়িয়েও পর্যাপ্ত শ্রমিক পেতে পারে। ফলে দেশের রপ্তানি বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি দীর্ঘদিন একই জায়গায় স্থবির হয়ে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে মজুরি মূলত বাড়ে শ্রমিকের জোরদার দরকষাকষি এবং আইনি কাঠামোর চাপের কারণে, যা মূলত মজুরি বোর্ডই সম্পন্ন করে থাকে। অন্যদিকে, ‘এফিশিয়েন্সি ওয়েজ’ বা দক্ষতামূলক মজুরি তত্ত্ব বলে যে, ভালো বেতন পেলে শ্রমিকেরা সহজে চাকরি ছাড়েন না, কাজে মনঃসংযোগ বাড়ে এবং তাদের পেছনে করা প্রশিক্ষণের খরচও উঠে আসে। তবে কেবল মজুরি বাড়িয়ে দিলেই যে উৎপাদনশীলতা রাতারাতি বেড়ে যাবে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
বাড়তি ব্যয়ের চাপ যেভাবে নিচুতলার মানুষটির ঘাড়েই এসে চাপে
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মূলত চারটি পক্ষ সামনে আসে, এবং প্রত্যেকেই আঙুল তুলছে অন্যের দিকে। প্রথমে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলোর কথাই ধরা যাক। ২০২৩ সালে ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান সংগঠন এএএফএর এক শীর্ষ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে তাঁরা ৫ থেকে ৬ শতাংশ দাম বাড়াতে প্রস্তুত রয়েছেন এবং সেই সঙ্গে প্রতি বছর একবার মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থাও চেয়েছিলেন। অথচ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সরবরাহকারীদের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা যায়, সেই ক্রেতাদের ৭৯ শতাংশই তখন পর্যন্ত কোনো দাম সমন্বয় করেননি।
এবারও বিজিএমইএর এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেছেন যে উৎপাদনকারীরা একা এই টেকসই মজুরি বৃদ্ধির চাপ সামলাতে পারবেন না; ক্রেতাদের পণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হবে। একই সঙ্গে ‘ক্লিন ক্লোথস ক্যাম্পেইন’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ৩২ হাজার টাকার মজুরিকে সমর্থন করে এবং এর বাড়তি খরচ বহন করে।
মালিকপক্ষের কাঁধে আসে কারখানার উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের লভ্যাংশের একটি অংশ ছেড়ে দেওয়া। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব হলো জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ব্যাংকের সুদের হার কমানো এবং বন্দরের দীর্ঘসূত্রিতা বা জট দূর করা। কারণ মালিকদের মতে, এসব অব্যবস্থাপনা অনেক সময় সরাসরি মজুরি বৃদ্ধির চেয়েও বেশি বাড়তি খরচ চাপিয়ে দেয়। সরকার চাইলে আরেকটি কাজ করতে পারে; সেটি হলো সরাসরি বেতনের ওপর চাপ না বাড়িয়ে খাদ্য, যাতায়াত, আবাসন ও চিকিৎসায় পরোক্ষ সহায়তা দেওয়া। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০২৪ সালে শ্রমিকেরা রেশনের দাবিতেও জোরালো আন্দোলন করেছিলেন।
আর শ্রমিকদের দিক থেকে প্রয়োজন হলো নিজেদের কাজের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে লক্ষ্যে পৌঁছানোর ধৈর্য ধারণ করা। অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বাড়তি খরচের মূল বোঝা শেষ পর্যন্ত সেই পক্ষের ঘাড়েই বেশি চাপে যাদের বিকল্প সুযোগ কম। যেহেতু কারখানা এবং শ্রমিক উভয়েরই বিকল্প অত্যন্ত সীমিত, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা চাইলে খুব সহজেই এক দেশের সরবরাহকারী বদল করে অন্য দেশে চলে যেতে পারে; তাই ক্রয়চুক্তিতে যদি ক্রেতার সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা লিখিত না থাকে, তবে এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ ঘুরেফিরে শেষ পর্যন্ত নিচুতলার মানুষটির ঘাড়েই এসে চাপে।
ন্যায্য মজুরি কত হওয়া উচিত, আর সেখানে পৌঁছানোর পথ কী?
আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ন্যায্যতার মাপকাঠিতে ২৭ হাজার থেকে ৩৩ হাজার টাকার একটি পরিসরই সবচেয়ে যৌক্তিক বলে মনে হয়; যার মধ্যে শিল্পাঞ্চলের জন্য তুলনামূলক কমের দিকে এবং ঢাকা শহরের জন্য ওপরের দিকের অঙ্কটি প্রযোজ্য। কিন্তু এই মুহূর্তে এক লাফে সেই অঙ্কে পৌঁছাতে গেলে শ্রমিকদের মজুরি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দিতে হয়, যার ফলে মোট উৎপাদন খরচ প্রায় ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে যেতে পারে। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য যখন ইতিমধ্যেই স্থবির এবং চারশোর বেশি কারখানা বন্ধ রয়েছে, তখন এই হুট করে দেওয়া অর্থনৈতিক ঝাঁকুনি বহু ছোট কারখানার জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। আর তেমনটি ঘটলে দিনশেষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ওই শ্রমিকেরাই।
তাই আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো একটি দুই ধাপের পথ অনুসরণ করা। প্রথম ধাপে, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের বেতন থেকেই শুরু বা সর্বনিম্ন গ্রেডের মজুরি বাড়িয়ে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকায় উন্নীত করা যেতে পারে। এটি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি, যা আমাদের অতীতের বড় মজুরি লাফের সীমার মধ্যেই পড়ে; তবে পার্থক্যের জায়গাটি হলো এবার সময়ের ব্যবধান পাঁচ বছরের পরিবর্তে মাত্র তিন বছর। এই পদক্ষেপে মোট উৎপাদন খরচ বড়জোর ৬ থেকে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে, যা ২০২৩ সালে মালিকপক্ষ নিজেরা যে হিসাব কষেছিল তার অনেকটাই কাছাকাছি।
দ্বিতীয় ধাপে, পরবর্তী চক্রের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৯ সালের শেষ নাগাদের মধ্যে বর্তমান বাজারমূল্যের সাপেক্ষে ২৭ হাজারের কাছাকাছি অঙ্কে পৌঁছানো যেতে পারে। আর এই দুই ধাপের মাঝের সময়টিতে নির্দিষ্ট ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের গতানুগতিক ধারা বাদ দিয়ে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একবার মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু করা দরকার। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠনগুলো তো ২০২৩ সালেই নিয়মিত বার্ষিক পর্যালোচনার কথা বলেছিল।
পাশাপাশি, বেতন কাঠামোর গ্রেডগুলোর প্রতিও নতুন করে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ২০২৩ সালের কাঠামোয় দেখা গেছে যে সবচেয়ে উঁচু এবং সবচেয়ে নিচের গ্রেডের মধ্যকার ব্যবধান মাত্র ১৮ শতাংশ। দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হলে শ্রমিকদের মধ্যে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বাড়তি আগ্রহও তৈরি হবে।
মনে রাখতে হবে, বাড়তি খরচের বড় অংশটি অবশ্যই ক্রেতার দেওয়া পণ্যের দামে প্রতিফলিত হতে হবে এবং তা কেবল মুখের কথায় নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ক্রয়চুক্তিতে আলাদা করে লিখিত থাকতে হবে। বাকি অংশ মেটানোর ভার পড়বে মালিকের উৎপাদন দক্ষতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি ও সুদের হার স্থিতিশীল রাখার ওপর। মজুরি বোর্ডের কাছে আমার প্রত্যাশা একটাই; শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় উল্লেখিত প্রতিটি বিষয়ের হিসাব যেন খোলাখুলিভাবে সামনে আনা হয় এবং একটি স্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বোর্ড যে অঙ্কই নির্ধারণ করুক না কেন, তা তখনই কেবল কার্যকর ও টেকসই হবে যখন সেটি কেবল কাগজের একটি নিছক সংখ্যা হয়ে না থেকে বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার একটি নিয়মে বাঁধা পড়বে। তা না হলে আগামী তিন বছর পর আমাদের আবারও একই নিবন্ধে নতুন কিছু সংখ্যা বসিয়ে নতুন করে লিখতে বসতে হবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

