বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি ফিরছে না। রপ্তানি আয় কমছে, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সামগ্রিক অর্থনীতির দুর্বলতা কাটছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু ডলারের সরবরাহ বাড়ানো নয়; বরং বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে রিজার্ভ বাড়লেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রত্যাশিত গতি ফিরবে না।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সংকুচিত হওয়ায় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা অর্থনীতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এই পূর্বাভাস সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। অর্থাৎ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সরকারি ব্যয়ের ধীরগতির প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়েও। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি ফেরার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ থেকে ২৪ অক্টোবর দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২০০ কোটি ২০ লাখ ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারে।
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৭২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৯৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। গত ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে। নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৬৪১ কোটি ১৮ লাখ ডলার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে।
তবে রিজার্ভের উন্নতিকে অর্থনীতির সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ, আমদানি ও বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে ডলারের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও শিল্প সম্প্রসারণে সেই অর্থ ব্যবহারের মতো পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে সাড়ে ১০ শতাংশ। একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট অব্যাহত থাকলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি আমদানি চাহিদাও দুর্বল থাকতে পারে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির দুর্বলতা অর্থনীতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। পরবর্তী সময়ে জুলাই ও আগস্টেও এই প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল।
অন্যদিকে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৫ শতাংশের বেশি। এর পাশাপাশি নভেম্বর থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সরকারের ব্যয়ের চাপও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল মনে করেন, দেশে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। তাঁর মতে, বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা ছাড়া অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংকও। গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও থমকে গেছে।
দেশের রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির দেখা মিলছে না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক থেকেও আয় কমেছে। আলোচ্য অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি কম থাকায় শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও তাঁদের জন্য মানসম্মত কাজের সুযোগ বাড়ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত। এতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং সঞ্চয় করার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আগামী দিনেও মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের উন্নতি কিছুটা স্বস্তি তৈরি করলেও বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা এখনো কাটেনি। অর্থনীতির এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই চলবে না। উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি না হলে রিজার্ভের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত স্বস্তি এনে দিতে পারবে না।

