আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কৃষি ভর্তুকি বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব তুলে ধরে। তবে অর্থ বিভাগ চলতি অর্থবছরের মতোই ভর্তুকির পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা রাখার পক্ষে মত দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া জানিয়েছেন, সার্বিক বিবেচনায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে সরকার যথাযথ পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখবে।
বাংলাদেশে কৃষি ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় হয় সারের পেছনে। পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি কেনা, কৃষি পুনর্বাসন, গবেষণা এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তা দিতেও সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে সারের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এছাড়া আগামী অর্থবছরে সারের চাহিদা আরো কিছুটা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে বাড়তি ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন পড়েছে এবং অর্থবছর শেষে এ পরিমাণ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল বাজেটে কৃষি ভর্তুকি ১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল।
তবে এখনো সব অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি ফলে বেসরকারি খাতের আমদানিকারকদের পাওনা থেকে যাচ্ছে এবং তারা সুদ দাবি করছে। কৃষি মন্ত্রণালয় এ সুদ পরিশোধের বিষয়ে একমত হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের পেমেন্ট ব্যবস্থা উন্নত করা না হলে আগামীতে সার সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
সরকার ইতোমধ্যে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়কে ১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানিকারকদের প্রদান করা হয়েছে। তবে এখন ব্যাংকগুলো বন্ড গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না যা সমস্যা সৃষ্টি করছে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল সরকার সার মূল্য বৃদ্ধি করেছিল। তখন সব ধরনের সারের দাম প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বাড়ানো হয়। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সারের দাম ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া ৪৮ টাকা, ডিএপি ৭০ টাকা, টিএসপি ৫০ টাকা এবং এমওপি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে সরকারকে এখনও ইউরিয়া সারে প্রতি কেজিতে ২১ টাকা, ডিএপিতে ৪৯ টাকা, টিএসপিতে ২৩ টাকা এবং এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
বর্তমানে কৃষির জন্য ৬৯ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে, যার ৮০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। সর্বশেষ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে প্রতি টন ইউরিয়া সার ৪২২ ডলারে কেনার অনুমোদন দেওয়া হয় যা প্রতি কেজি ৫১.৪৮ টাকা পড়ে। পরিবহন খরচ, মজুত ক্ষতি ও ডিলার কমিশন যুক্ত করে এর চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সারের দাম আর বাড়াবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার ফলে সরকারকে বাড়তি ভর্তুকি প্রদান করতে হতে পারে।
অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার সামগ্রিকভাবে ভর্তুকি নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) শর্ত মেনে চলার জন্য ধীরে ধীরে ভর্তুকি হ্রাস করতে হবে। তবে কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে যদিও তার ধরন পরিবর্তন হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি ভর্তুকি অপরিহার্য। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু খাতে ভর্তুকি কমানো এবং অপচয় রোধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষকদের কাছে এই সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষি উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

