কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে করদাতাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি আনতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিলে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও কাস্টমস সংক্রান্ত আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে আগাম জমা বা আপিল ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই উদ্যোগ করদাতাদের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ আরও সহজ, দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল করে তুলবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় আয়কর সংক্রান্ত বিরোধে কমিশনার (আপিল) থেকে শুরু করে হাইকোর্ট পর্যন্ত তিন ধাপে আপিল করতে কর কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দাবিকৃত করের মোট ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত জমা দিতে হয়। প্রস্তাবিত অর্থবিলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সেই হার কমিয়ে মোট ১৪ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। একইভাবে ভ্যাট ও কাস্টমস সংক্রান্ত দাবির ক্ষেত্রে বর্তমানে মোট ২০ শতাংশ জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের পক্ষ থেকে আপিল প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানানো হচ্ছিল। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আয়কর আপিলের প্রথম ধাপ অর্থাৎ কমিশনার (আপিল)-এর কাছে আবেদন করতে বিরোধপূর্ণ করের মাত্র ১ শতাংশ জমা দিতে হবে। বিরোধপূর্ণ কর বলতে উপকর কমিশনারের নির্ধারিত কর এবং করদাতার স্বীকৃত করের মধ্যে পার্থক্যকে বোঝানো হয়েছে। বর্তমানে আয়করের ক্ষেত্রে এই ধাপে কোনো অর্থ জমা দিতে হয় না। তবে ভ্যাট ও কাস্টমসের আপিলে প্রথম ধাপে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সব ধরনের প্রথম আপিলের জন্য জমার হার ১ শতাংশে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কর আপিল ট্রাইব্যুনাল পর্যায়েও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে এই পর্যায়ে আপিল করতে বিরোধপূর্ণ করের ১০ শতাংশ জমা দিতে হয়। নতুন অর্থবিলে সেই হার কমিয়ে মাত্র ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মূসক সংক্রান্ত আপিল ব্যবস্থাতেও শর্ত শিথিল করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, মূসক কমিশনার (আপিল)-এর কাছে আবেদন করতে দাবিকৃত করের, জরিমানা বাদে, মাত্র ১ শতাংশ জমা দিলেই হবে।
কাস্টমস বা শুল্ক সংক্রান্ত আপিল ব্যবস্থায়ও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। কাস্টমস কমিশনারের কাছে আপিল দায়েরের সময় দাবিকৃত শুল্ক, কর ও জরিমানার মাত্র ১ শতাংশ জমা দিতে হবে। আর হাইকোর্ট বিভাগে কাস্টমস সংক্রান্ত আপিলের ক্ষেত্রে জমার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ শতাংশ।
শুধু জমার হার কমানোই নয়, প্রস্তাবিত বিলে কর কর্মকর্তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা বা ডিসক্রিশনারি পাওয়ারও সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আপিল প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা আসবে এবং করদাতাদের হয়রানির সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, একটি কার্যকর করব্যবস্থা হতে হবে স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক। আপিল প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে কর প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে জটিলতা ও অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের ওপর মানসিক এবং আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। এই বাধা কমানো গেলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে, পাশাপাশি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতি বাড়বে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আপিল প্রক্রিয়ায় কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার কারণে অনেক সময় করদাতারা নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হন। সে কারণেই আপিল, ট্রাইব্যুনাল এবং হাইকোর্ট পর্যায়ে আগাম জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে করদাতারা কম খরচে এবং সহজে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পান।

