বিশ্বের শীর্ষ দশ আম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় স্থান থাকলেও রপ্তানির দিক থেকে এখনও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, কৃষি উৎপাদনে ‘গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস’ (গ্যাপ) না মানা, মানসম্পন্ন প্যাকেজিংয়ের অভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড ইমেজ সংকট এবং বিমানের উচ্চ ভাড়া এই সবকিছুকেই রপ্তানি পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও চলতি মৌসুমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার টন যা আগের মৌসুমের তুলনায় তিন হাজার ৬৭৯ টন বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি আম মৌসুমে দেশে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমিতে আনুমানিক ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার টন আম রপ্তানিযোগ্য বলে বিবেচিত। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি মৌসুমে দেশে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হয়ে থাকে যার একটি ক্ষুদ্র অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। গত মৌসুমে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল দেড় হাজার টন এবার তা তিনগুণেরও বেশি বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টনে উন্নীত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে চীনে আম রপ্তানির বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও জাপানেও রফতানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রংপুরে। বিগত অর্থবছরগুলোয় উৎপাদন পরিমাণে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন আম উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টনে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা কমে উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন।
উৎপাদনের এই উচ্চমাত্রা থাকা সত্ত্বেও রফতানির চিত্র তুলনামূলকভাবে নাজুক। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১ হাজার ৭৫৭ টন আম রফতানি করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে হয় ১ হাজার ৭৮৮ টন। তবে গত অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩২১ টনে। এই পটভূমিতে চলতি মৌসুমে পাঁচ হাজার টন রফতানির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে বিশ্লেষকরা ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশে উৎপাদিত আমের জাতের তালিকাও বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। দেশের প্রায় ১০টি জেলায় উৎপাদিত হয় ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাতি, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্ণরেখা, মিশরিদানা, নীলাম্বরি, কালিভোগ, কাঁচামিঠা, আলফানসো, বারোমাসি, তোতাপুরী, কারাবাউ, কেউই সাউই, গোপাল খাস, কেন্ট, সূর্যপূরী, পাহুতান, ত্রিফলা, হাঁড়িভাঙ্গা, ছাতাপড়া, গুটলি, লখনা, আদাইরা, কলাবতী ও রুপালি জাতের আম। এই সব জাতের আম শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণেই নয়, বিদেশেও রপ্তানির করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের আম ৩৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, ইতালি ও সৌদি আরব প্রধান গন্তব্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, কুয়েত, কাতার, ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও আম পাঠানো হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে আমের উৎপাদন খুবই অনুকূল পরিবেশে হয়। তিনি জানান, “প্রতি মৌসুমে দেশে প্রায় ২০-২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হয় যা বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। আমাদের আম অনেক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে এবার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত দেশগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী আম সরবরাহ করতে পারলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।”
নতুন বাজার হিসেবে চীনের কথা উল্লেখ করে আরিফুর রহমান বলেন, “চীন বাংলাদেশ থেকে আম কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। এতদিন কিছু শর্ত ও বিধিনিষেধ থাকলেও এখন সেগুলো কেটে গেছে। তাই আশা করছি, এবার সর্বোচ্চ পরিমাণে আম রপ্তানি করা সম্ভব হবে।”
তবে ৪০ হাজার টন রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন হলেও মাত্র পাঁচ হাজার টন রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা কেন নির্ধারণ করা হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “আমাদের মতো আরও অনেক দেশ আম উৎপাদন করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির করে থাকে। সব দেশে আমাদের পক্ষে রপ্তানি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া বড় একটি বাধা হচ্ছে বিমানের অতিরিক্ত ভাড়া ও কার্গো সংকট। ভারত ও পাকিস্তানে যেখানে বিমান ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম সেখানে আমাদের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি। বিমান ভাড়া কমলে এবং পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা মিললে আম ও অন্যান্য সবজি রপ্তানিও অনেক বাড়ানো সম্ভব।”
এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সরকারের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তা ও রপ্তানির জন্য সুনির্দিষ্ট অবকাঠামোগত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন আমচাষি ও রফতানিকারকেরা। উৎপাদন ও রফতানির এই ব্যবধান কমাতে হলে মানসম্পন্ন প্যাকেজিং, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

