আগামী জাতীয় বাজেট প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিএনপি জোট সরকারের প্রস্তুত করা এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেই লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে বড় সংস্কার আনা হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার দেশের সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যবসাই ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া চালানো যাবে না। শুধু তাই নয়, ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া থেকে শুরু করে আরও সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ হলেও ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মাত্র সাত লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দেয় পাঁচ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। ফলে বিশাল অংশ কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছে সরকার।
নতুন বাজেট প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানই ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে থাকতে পারবে না। এমনভাবে শর্ত তৈরি করা হচ্ছে, যাতে নিবন্ধন এড়ানো কার্যত সম্ভব না হয়। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচিতি নম্বর (বিআইএন) ছাড়া সেবা গ্রহণের সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে।
ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল আর্থিক সেবায় মার্চেন্ট হিসাব খোলা, ট্রেড বডির সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ এবং বিআরটিএ থেকে ব্যবসায়িক যানবাহনের নিবন্ধন নিতে হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, ভ্যাটের আওতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। বাজেট প্রস্তাবে ব্যবসায়ী বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি পণ্যের আকৃতি বা গুণগত পরিবর্তন না করে বিক্রি বা হস্তান্তর করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভ্যাট নিবন্ধনের আওতা বাড়ালে সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের বহু প্রতিষ্ঠান কর ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। এতে প্রায় ২০ লাখ নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আসতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী দেশে অর্থনৈতিক ইউনিট এখন এক কোটি ১৭ লাখ, যার ৯৯ শতাংশই কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। এর ৭৪ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায়। তবে এই বিস্তৃত অর্থনীতির বড় অংশই কর কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।
বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাত লাখ ৭৫ হাজার হলেও এর মধ্যে মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দেয়। এ পরিস্থিতিতে ভ্যাট নিবন্ধনের বার্ষিক টার্নওভার সীমা তিন কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৬৫টি বণিক সমিতিকে সদস্য তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমালোচনাও রয়েছে। নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেওয়া বা বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগের মতো সেবায় ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা ব্যবসা সহজীকরণের পথে বাধা হতে পারে। তার মতে, সব কার্যক্রম যদি পুরোপুরি অনলাইনে ও হয়রানিমুক্ত না করা হয়, তাহলে দুর্ভোগ বাড়বে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে ভ্যাট আদায় বাড়তে পারে, তবে তা যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঠিকভাবে জমা হয় এবং অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক খরচ বা ঘুষের সুযোগ তৈরি না করে। নতুন বাজেটে কিছু পণ্যে ভ্যাট কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রথমবারের মতো মদ্যপ পণ্যে লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব আসছে, যা থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে।
স্বর্ণালংকার খাতে প্রতি ভরি ও প্রতি ক্যারেট হীরায় দুই হাজার টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে এ খাতে পাঁচ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। এতে রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন।
প্রসাধনসামগ্রী খাতে কিছু পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে এসব পণ্য তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হয়। ভ্যাট আপিল ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে আপিলের সময় ১০ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হয়, যা কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
মোবাইল সিম ও ই-সিমে বর্তমানে ৩০০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট রয়েছে। এটি তুলে দিয়ে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে, যাতে গ্রাহকের খরচ কমে। ব্যাংকে জমার ওপর আবগারি শুল্কের সীমাও পরিবর্তন হচ্ছে। তিন লাখ টাকার পরিবর্তে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো শুল্ক না কাটার প্রস্তাব রয়েছে। পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে ৫০০ টাকা শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
শিল্প খাতে স্ক্র্যাপ লোহা ও জাহাজ ভাঙা থেকে পাওয়া এমএস পণ্যের ভ্যাটও বাড়তে পারে। ফটোস্টুডিওতে ছবি তোলার ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে সিগারেট খাতে ভ্যাট কাঠামোয় পরিবর্তন না থাকলেও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভ্যাট খাতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। প্রথম ১০ মাসে আদায় হয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে দুই লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, যা অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

