দেশে কয়েক বছর ধরেই রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই চাপ সামাল দিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটেও শুল্ক ও কর আদায়ে কঠোর অবস্থানে থাকতে পারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির চাপও বেড়েছে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য এবার আরও বড় হচ্ছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকারও প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই দুই বড় ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে রাজস্ব আদায়ের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ছে।
নতুন অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন খাতে শুল্ক ও কর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর কিছু ক্ষেত্রে করের চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব আসতে পারে। আগামী অর্থবছরে এই সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকায় উন্নীত করার কথা রয়েছে। পরবর্তী দুই বছর এটি চার লাখ টাকায় স্থির রাখার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।
এ ছাড়া নারী করদাতা, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী করদাতা, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহতদের করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব থাকতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও করছাড় সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
আগামী অর্থবছর থেকে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। তবে শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী ও পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ছাড় থাকতে পারে। এ ছাড়া ১৫০ সিসির বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আসতে পারে। বর্তমানে দেশে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
আগামী বাজেটে সারা বছর কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন দিলে করছাড় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে দেরিতে রিটার্ন দিলে পাঁচ হাজার টাকা বা প্রদেয় করের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধান থাকতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদের আয় করমুক্ত রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু খাতে করছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের কর সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে। রপ্তানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় আছে। কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উৎসে কর হার কমিয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব আসতে পারে।
খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে প্রতি হাজার টাকায় দুই টাকা কর দিতে হতে পারে, যা বছর শেষে সমন্বয় করা হবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে এই খাতে করের চাপ প্রায় ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে দামের ভিত্তিতে এটি কমিয়ে ৬৪ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে আনা হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।
নতুন কর কাঠামোর কারণে কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ি, পয়েন্ট অব সেল মেশিন, মোবাইল ফোন উৎপাদন উপকরণ, এসি ও ফ্রিজ। অন্যদিকে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সিগারেট ও বিড়িসহ তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আমদানি করা কাজুবাদাম, রড, পাঙাশ ফিলেটসহ কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ার প্রস্তাবও রয়েছে। লিপস্টিক, লোশন ও ফেসওয়াশসহ কিছু সৌন্দর্যপণ্যের আমদানি মূল্যায়ন কমালে বাজারে দাম কমতে পারে।
চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব ঘাটতি বড় আকারে রয়েছে। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মোট আদায়ও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর আদায়ের পদ্ধতি সহজ না হলে এই ঘাটতি কমানো কঠিন হবে। কর ব্যবস্থা ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আগামী বাজেট ঘিরে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায়ের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কিছু খাতে স্বস্তি ও কর ছাড়ের ইঙ্গিতও রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের ওপর করের ভার কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত বাজেট ঘোষণার ওপর।

