সরকার আগামী ২০২৫-২০২৮ মেয়াদের নতুন আমদানি নীতি আদেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিদেশে একবার পরীক্ষা করা পণ্যের আর দেশে আলাদা করে পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। আমদানিকারকদের জন্য এটি একটি বড় ধরনের সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এই সিদ্ধান্ত যুক্ত করে নতুন আমদানি নীতি আদেশ চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
গত ১৩ মে সচিবালয়ে বাণিজ্য সচিব মো. মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪’-এর সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ব্যবসায়িক বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমান আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪-এর মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের জুনে। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন আদেশ না আসা পর্যন্ত পুরোনো নীতি বহাল থাকে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন আমদানি নীতি কার্যকর করা। এজন্য এরই মধ্যে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, এটি উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানোর আগে আরও একটি বৈঠক হতে পারে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে, যদিও সেটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই নতুন নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে।
নতুন নীতিতে নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক কোনো নিয়ম না থাকলেও ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি সহজ ও বাধা দূর করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমদানি করা খাদ্যপণ্যের ছাড়পত্র প্রদান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সরকার অনুমোদিত গবেষণাগারের তালিকা এবং মান নির্ধারণের প্রক্রিয়াও যুক্ত করা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনায়ও জোর দেওয়া হচ্ছে নতুন নীতিতে। হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধের পাশাপাশি শব্দদূষণ রোধে ১০০ ডেসিবেল মাত্রা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। হর্ন, প্লাস্টিক খেলনা, ব্যাটারি রিসাইক্লিং এবং গ্যাস সিলিন্ডারের এইচএস কোড সংক্রান্ত সুপারিশও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তেল ও গ্যাস খাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল, পেট্রোলিয়াম গ্যাস, পুরোনো মোটরসাইকেল, কারেন্ট জাল, পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি এবং এলএনজি ব্যতীত অন্য কিছু গ্যাসজাত পণ্য আমদানিতে শর্ত আরোপ করা হচ্ছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, পুরোনো কাপড় আমদানি এখন স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার পুরোনো কাপড় আমদানি হয়। সরকার এই খাতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে চায়।
নতুন নীতিতে আরও কিছু পণ্য একেবারে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকছে। যেমন, চিংড়ি, পপি বীজ, পোস্তদানা, রিকন্ডিশন্ড পণ্য, পুরোনো ইলেকট্রনিকস, বিভিন্ন বর্জ্য ও শিল্প স্লাজ। এ ছাড়া অশ্লীল ও রাষ্ট্রবিরোধী সাহিত্য, মানচিত্র, হরর কমিকস, ভৌগোলিক গ্লোব, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট—যেগুলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা সংস্কৃতি বিরোধী, সেগুলোও নিষিদ্ধ থাকবে।
দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট থ্রি-হুইলার, উচ্চমাত্রার শব্দহর্ন, পলিথিন ব্যাগ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক যেমন ডিডিটি, এলড্রিন, ক্লোরডেনসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ কীটনাশকও আমদানি করা যাবে না। পুরোনো জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রেও বিষাক্ত বর্জ্য পরিবহন না করার শর্তে রপ্তানিকারকের প্রত্যয়নপত্র ও আমদানিকারকের ঘোষণাপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র খাতে যৌথ প্রযোজনার বাইরে উপমহাদেশীয় ভাষায় নির্মিত কোনো সিনেমা আমদানি নিষিদ্ধ থাকবে। তবে দেশের চলচ্চিত্র রপ্তানির বিপরীতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্রের ভিত্তিতে সমসংখ্যক সিনেমা আমদানি করা যাবে।
খেলনার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। পণ্যটি কোন বয়সসীমার শিশুদের জন্য তা উল্লেখ করতে হবে এবং প্লাস্টিকের খেলনার ক্ষেত্রে তা ‘স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়’ এমন সনদ রপ্তানিকারক দেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ থেকে আনতে হবে।
পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল ইথাইলিন ও প্রপাইলিনকে নতুন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অনুরোধ অনুযায়ী মদ ও বিয়ার পণ্যের এইচএস কোড হালনাগাদ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় চাল ও মসলা রপ্তানিতে সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত মিথাইল ব্রোমাইড আমদানিনিষেধ—এই বিষয়েও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া হবে। এদিকে অ্যাকুমিলেটর ব্যাটারি রপ্তানিকারকরা পুরোনো ব্যাটারি আমদানির অনুমতি চেয়েছে পরিবেশবান্ধব পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের শর্তে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম আমদানি মূল্য নির্ধারণের প্রথা ধাপে ধাপে তুলে দেওয়ার কথা নতুন নীতিতে উল্লেখ থাকবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ খসড়া প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “নতুন আমদানি নীতির খসড়া উপদেষ্টা পরিষদে যাচ্ছে। কিন্তু এটি নিয়ে ভালোভাবে আলোচনার সুযোগ হয়নি। যদি আরেকটা বৈঠক হয়ও, তাতে মাত্র দুই মিনিট সময় দিলে যথাযথ মতামত দেওয়া সম্ভব নয়।”
সব মিলিয়ে, আসন্ন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৫-২৮-এর খসড়ায় আমদানি প্রক্রিয়া সহজ, পরিবেশবান্ধব, আধুনিক এবং বৈশ্বিক নিয়মনীতি অনুযায়ী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতিতে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা, জনস্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার দিকটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

