অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় এটি ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি। মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশের সমান এই বাজেট। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় প্রস্তাবিত নতুন বাজেট প্রায় ১ হাজার ১৯৩ গুণ বড়।
সাধারণত দেশে বাজেট বৃদ্ধির হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। তবে এবার সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা বাজেটের আকার বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি সঙ্কুচিত বা আঁটসাঁট বাজেট প্রস্তাবই বেশি কার্যকর হতো—এমন মতও রয়েছে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে। নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী বছরে রাজস্ব আদায় প্রায় ৩৯ শতাংশ বাড়ানোর বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলে বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়তে পারে। এতে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদনশীল খাতগুলোও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়বে।
গত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অর্জন হয়েছে তার চেয়েও অনেক কম, ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তারও আগের বছরে তা ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
নতুন বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কিন্তু অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের হার ও গুণগত মান সন্তোষজনক না হলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এটি আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। গত মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
কৃষি উৎপাদনে বিঘ্ন, বিশেষ করে বোরো ধানের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও অনমনীয় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন বা অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৬৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এই ব্যয় কাঠামোকে ভারসাম্যহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরোনো কর্মীদের সুবিধা বাড়ানোর বদলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে কৃষি খাতে বরাদ্দ কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। আগামী অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এর মধ্যে শস্য কৃষি খাতে বরাদ্দ ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বাকি ১ দশমিক ৯১ শতাংশ বরাদ্দ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে কৃষি খাতের অংশীদারিত্ব ক্রমাগত কমছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা ছিল ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশে। নতুন বাজেটে তা আরও কমে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কৃষি প্রবৃদ্ধিও নিম্নমুখী। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৪২ শতাংশে। নতুন অর্থবছরে এটি ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি। সেই লক্ষ্যে মোট বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফসল খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৭ হাজার ১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গত বছরের মূল বাজেটের তুলনায় এটি ২৪০ কোটি টাকা কম। কৃষি ভর্তুকির অংশীদারিত্বও ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১১-১২ সালের সংশোধিত বাজেটে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২ দশমিক ১৮ শতাংশে। নতুন বাজেটে এটি আরও কমে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি ভর্তুকির এই ধারাবাহিক হ্রাস অনাকাঙ্ক্ষিত। এতে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা মনে করেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হলে ভর্তুকি মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে কৃষিসংশ্লিষ্ট চারটি মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ কমেছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
এর মধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সেচ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমেছে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পাট মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে ১১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ। উৎপাদন খাতের এসব মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ হ্রাসকে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে ব্যয় রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। এ খাতে বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৭৭ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা বা ৪১ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। এই ব্যয় মোট বাজেটের ২৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা খাত যুক্ত করলে মোট বাজেটের প্রায় ৩৬ শতাংশ এই খাতে ব্যয় হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, মন্ত্রণালয়গুলোতে কর্মচারীর সংখ্যা কমানো এবং প্রশাসনিক ধাপ হ্রাস করা হলে ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। এছাড়া তারা বেতন কাঠামো সংস্কারের প্রসঙ্গেও মত দিয়েছেন। অতীতে নতুন পে-স্কেলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির নজির থাকলেও পরে তা ১২০ শতাংশের বেশি পর্যন্ত গিয়েছে। এবারও প্রায় একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তাদের মতে, এই ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। নতুন পে-স্কেল প্রণয়নে সেবা গ্রহণকারী ও করদাতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাজেট প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া সচিবালয়ের প্রভাবমুক্ত রেখে একটি নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে করার প্রস্তাবও এসেছে। অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। আগের বাজেটের তুলনায় এ খাতে ২০ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক ও সমর্থনযোগ্য পদক্ষেপ।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। গত বাজেটে এই বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। ফলে এবার বরাদ্দ বেড়েছে ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এই বরাদ্দ পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একত্রে ব্যবহৃত হবে। মন্ত্রণালয়গুলো হলো সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে বয়স্ক ভাতা মাসে ৬৫০ টাকা এবং বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতা ৯০০ টাকা দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজেটে এসব ভাতায় যথাক্রমে ৫০ টাকা ও ১০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের মূল বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। তা বেড়ে এবার দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা ১১৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ একটি ইতিবাচক ও সমর্থনযোগ্য উদ্যোগ।
অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজেটে বেশ কয়েকটি কর ও শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চাল, গম ও তেলের মতো পণ্যে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। ভোজ্যতেল উৎপাদনে পাঁচ বছরের জন্য কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। মসলা ও খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কীট ও বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামালে মূল্য সংযোজন কর শূন্য করা হয়েছে। জিঙ্ক সালফেট সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। ভেটেরিনারি ওষুধ আমদানিতেও শুল্ক রেয়াত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং কীটনাশক আমদানির ওপর আরোপিত একই হারের আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর ও শুল্ক ছাড়ের ফলে নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
তবে কাজুবাদামের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা দেশীয় উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে দেশীয় মৎস্য শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ করহার আগের মতোই ৩০ শতাংশ রাখা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হলে নিম্ন আয়ের করদাতারা আরও কিছুটা স্বস্তি পেতেন।
অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য বাজেটে একটি ধাপে ধাপে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রথম ধাপে এক বছরের জন্য পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, দ্বিতীয় ধাপে এক থেকে তিন বছরের মধ্যে অর্থনীতির উত্তরণ এবং তৃতীয় ধাপে পাঁচ বছরের মধ্যে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। নতুন বাজেট বাস্তবায়নে সরকার সফল হবে—এমন প্রত্যাশাও সংশ্লিষ্ট মহলের।

