জাতীয় বাজেটকে সাধারণভাবে রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হলেও এর গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। একটি দেশের বাজেট আসলে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, উন্নয়ন কৌশল এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। বাজেট বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সরকার কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কার উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কোন জনগোষ্ঠী এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় বরাদ্দ ও উদ্যোগ কতটা কার্যকর? ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটও সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে এটি নারীর উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর কিছু ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও বিনিয়োগের পর্যাপ্ততা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি করছে।
সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবৃদ্ধিনির্ভর বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিচর্যা অর্থনীতি ঘিরেও নতুন কিছু পরিকল্পনার ঘোষণা এসেছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবে নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং পর্যাপ্ত অর্থায়ন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জেন্ডার বাজেট কী?
জেন্ডার বাজেট বা জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেটিং এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সরকারি নীতি, কর্মসূচি ও ব্যয়ের প্রভাব নারী ও পুরুষের ওপর কীভাবে ভিন্নভাবে পড়ছে তা বিশ্লেষণ করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদের ব্যবহার করে বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর সুযোগও মূল্যায়ন করা হয়। এটি কোনো আলাদা নারী বাজেট নয় এবং শুধু নারীদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়ও নয়। বরং বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে জেন্ডার সমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার একটি কৌশলগত ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটিংয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯-১০ অর্থবছরে। সে সময় মাত্র চারটি মন্ত্রণালয়কে এই উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে ৬১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জেন্ডার বাজেটিং উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের সঙ্গে একটি পৃথক জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যয়কে জেন্ডার-সম্পর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণ—এই চারটি প্রধান বিষয়ের আলোকে উপস্থাপন করা হয়।

