বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এক ক্ষেত্র। প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি ব্যাংক-ভিত্তিক অনিয়ম, ঋণখেলাপি, রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর। অথচ এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপরই নির্ভর করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। আজ যখন রাষ্ট্র স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্যতম শর্ত— একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক ব্যাংকিং খাত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো ব্যাংকের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই হোক, মানুষের মনে যদি সেই ব্যাংকের প্রতি বিশ্বাস না থাকে, তাহলে সেই ব্যাংক কাঠামোগত সাফল্যের মুখ দেখলেও কার্যকর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্জন করতে পারবে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়—সমস্যা ব্যাংকের সংখ্যা বা সেবা নয় বরং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব, খেলাপি ঋণে জবাবদিহির সংকট এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই জনসাধারণের আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও আস্থা বাড়েনি: বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ছিল মোট ৬১টি। এসব ব্যাংককে মূলতঃ চারটি বিভাগে ভাগ করা যায়—রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংক।
তবে দেশের আর্থিক খাত শুধুমাত্র ব্যাংক কেন্দ্রিক নয়। ব্যাংক ছাড়াও বাংলাদেশে নানা ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বর্তমানে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০০টিরও বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ৩৪টি অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৩টি বিশেষায়িত তফসিলি ব্যাংক এবং ৭৮টি বীমা কোম্পানি।যেগুলোর মধ্যে জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা উভয়ই রয়েছে।
এছাড়াও মূলধন বাজারে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিবন্ধিত দুটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে অসংখ্য মাইক্রো ক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে। যারা মূলতঃ নিম্ন আয়ের মানুষদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতও উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত। এর মধ্যে লিজিং কোম্পানি, বিনিয়োগ কোম্পানি, মুদারাবা কোম্পানি এবং হাউজ ফাইন্যান্স কোম্পানি রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সেবা প্রদান করে থাকে। এসব তথ্য দেখলে মনে হতে পারে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কাঠামোগতভাবে ব্যাংকের বিস্তার সন্তোষজনক হলেও মানুষের আস্থা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে এটি ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ।
এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, সাধারণ আমানতকারীর আস্থাও দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই খেলাপি ঋণের বড় অংশই রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ছত্রছায়ায় গৃহীত, যা আদায়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে, তারা ব্যাংকে টাকা জমা দিলেও সেই অর্থ অনিয়মের কারণে নিরাপদ থাকছে না। বিশেষ করে যখন দেখা যায় প্রভাবশালীরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলেও তেমন শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন না, তখন একজন সাধারণ আমানতকারীর ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু ঋণখেলাপিই নয় গ্রাহকসেবা ঘিরেও ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। অনেক ব্যাংকেই অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা দুর্বল, অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায় না, কিংবা সমাধান পেতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। আবার অনেক ব্যাংক একই ধরনের সেবার জন্য বিভিন্ন হারে সুদ ও ফি নির্ধারণ করে, যা গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করে এবং ক্ষোভ তৈরি করে।
ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াও এখনো অনেক জটিল ও সময় সাপেক্ষ। মধ্যবিত্ত কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া কঠিন, অথচ বড় কর্পোরেট গ্রাহকদের জন্য প্রক্রিয়া অনেক সহজ ও নমনীয়। অন্যদিকে, ব্যাংকের শাখা বাড়ানো হলেও সেবার মান সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। শাখা থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় গ্রাহকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তার প্রভাব পড়ে। এমন বাস্তবতায় মানুষ তাদের সঞ্চয় রাখার জন্য ব্যাংকের পরিবর্তে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও মানুষের মধ্যে আস্থা জন্মায়নি। কারণ শুধু পরিকাঠামো গড়ে তুললেই আস্থা তৈরি হয় না—এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিশ্বাসযোগ্য গ্রাহকসেবা। আর এই জায়গাতেই আমাদের ব্যাংকিং খাত এখনো পিছিয়ে।
আর্থিক কেলেঙ্কারির ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিকতা:
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে বারবার আলোচনায় এসেছে। এসব কেলেঙ্কারি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং সময়ের ধারাবাহিকতায় ক্রমাগত ঘন ঘন ঘটছে—যা গোটা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
গত ১৫ বছরে দেশে অন্তত ২৪টি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। যেখানে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ বা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে। এই সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ২০২৩ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা, যেখানে দেশের একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী একাধিক ব্যাংক থেকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়। এই ঋণ পাওয়া এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে যখন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) জানায়—দেশের ৩২টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে তদন্ত চলছে। এসব তদন্ত আর্থিক অপরাধ, মানি লন্ডারিং ও জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরিচালিত হচ্ছে।
এই ধারাবাহিক আর্থিক দুর্নীতির পেছনে একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতা কাজ করেছে। অন্যদিকে জবাবদিহিতার অভাব ও দুর্বল তদারকিও সমানভাবে দায়ী। এর ফলে শুধু ব্যাংক খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা, আস্থা ও ভবিষ্যতের উপরও এর প্রভাব পড়ছে। যদি এই অবস্থার দ্রুত সংস্কার না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগণের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনাস্থা:
আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে সুসংগঠিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। অথচ বাংলাদেশে শহরের বাইরে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগণের মধ্যে এখনো ব্যাংকের প্রতি একধরনের গভীর অনাস্থা বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)–এর ২০২৩ সালের তথ্যানুসারে, দেশের প্রায় ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরেই রয়ে গেছেন। এর প্রধান কারণ—ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ নিরাপদ কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক সন্দেহ ও আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় সমিতি, এনজিও বা হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। যদিও এসব বিকল্প ব্যবস্থার তেমন কোনো জবাবদিহিতা নেই, তবুও ব্যাংকের তুলনায় এগুলোকেই অনেক বেশি “বিশ্বাসযোগ্য” মনে করছেন প্রান্তিক জনগণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—সরকার যখন “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তখনো দেশের লাখো নারী, কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংকের মূলধারায় ঢুকতে পারছেন না শুধুমাত্র আস্থার অভাবে।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে প্রায়ই গণমাধ্যমে দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ এবং আমানতকারীর অর্থ অনিরাপদ থাকার খবর প্রকাশিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে একরকম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকে মনে করেন সঞ্চয় ব্যাংকে না রেখে হাতের কাছেই রাখা নিরাপদ।
এই বিশ্বাসের সংকট কাটাতে হলে শুধু অর্থনৈতিক নীতির উন্নয়ন নয় প্রয়োজন গ্রাহকবান্ধব, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ ব্যাংকিং পরিবেশ। ব্যাংকের শাখা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ জনগণের আর্থিক শিক্ষাও জরুরি, যাতে তারা বুঝতে পারেন কোনটি নিরাপদ আর কোনটি প্রতারণামূলক।
প্রযুক্তি আসছে কিন্তু আস্থা ফিরছে না:
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গত এক দশকে প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। এখন আর শুধু ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরতে হয় না—ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন: বিকাশ, নগদ, এজেন্ট ব্যাংকিং, এটিএম, এমনকি ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবাও চালু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপস-ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখেরও বেশি। ওই এক মাসেই এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা দিন দিন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই অগ্রগতির সঙ্গেও মানুষের আস্থা তেমন বাড়ছে না। কারণ প্রযুক্তি যত সহজ হচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও ততটাই জটিল হচ্ছে। ২০২০ সালের শুরুর দিকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতা ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ায়, ওই বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ দৈনিক অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ থেকে ৮০০-তে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৬২৮টি সাইবার অপরাধের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ মামলাই মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে প্রতারণা সংক্রান্ত। অনেক সময় ব্যাংক কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগও উঠে আসে। যাঁরা গ্রাহকের গোপন তথ্য অসাধু চক্রের কাছে পাচার করেন।
ইদানীং একধরনের প্রতারণা বেশি দেখা যাচ্ছে, যেখানে ভুয়া কাস্টমার কেয়ার নম্বর বা লিংক ব্যবহার করে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ঢুকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফিশিং (Phishing) এবং স্পুফিংয়ের মাধ্যমে তথ্য চুরি করার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
প্রযুক্তিগত সুবিধা যেমন দরকার, তেমনি দরকার নিরাপত্তা ও সচেতনতা। কারণ শুধু নতুন প্রযুক্তি দিলেই হবে না—মানুষকে তার ব্যবহার শেখাতে হবে, আস্থা তৈরি করতে হবে এবং প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রাহকবান্ধব ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
মূল সমস্যা হলো নৈতিকতার অবক্ষয়:
ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের পেছনে শুধু আর্থিক নীতির দুর্বলতা নয়, রয়েছে গভীর নৈতিক অবক্ষয়। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ব্যক্তির পরিচয় ও রাজনৈতিক সংযোগ। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যেখানেই ঋণের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফিরেও ব্যর্থ হন, সেখানে বড় ব্যবসায়ীরা একাধিক ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়েই বহাল তবিয়তে থাকেন।
এছাড়া ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM)-এর ২০২১ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন, “Operating Governance in Banks: The Role of Board of Directors”, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছে।
এতে ব্যাংকিং খাতে পরিচালনা পর্ষদের হস্তক্ষেপের ফলে ঋণ খেলাপি, তারল্য সংকট, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং সুশাসনের অভাবের মতো সমস্যাগুলোর উদ্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন গুলোতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হস্তক্ষেপের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয় বরং সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
এই ধরনের অনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং সেক্টরের স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে। যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের আস্থার ওপরও। নীতিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন মূল্যবোধভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। যেখানে যোগ্যতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্বই হবে ব্যাংকিং নীতির মূলভিত্তি।
অনেক ব্যাংক অতিরিক্ত ও লুকানো ফি কেটে নেয়। যা গ্রাহকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং আস্থার সংকট তৈরি করে। এসব ফি স্পষ্টভাবে জানানো এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ব্যাংক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাজনীতি যখন অনিশ্চিত হয় তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, যা ব্যাংকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— ব্যাংকগুলোকে তাদের সমস্ত কার্যক্রমে সতর্কতা ও জবাবদিহিতার চর্চা করতে হবে। ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বা লেনদেনের প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। বড় দুর্নীতির ঘটনা এড়াতে চাইলে অভ্যন্তরীণ তদারকি জোরদার করতে হবে। এই আস্থা সংকট কাটিয়ে উঠতে কিছু মৌলিক সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রথমত: বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা আরও দৃঢ় করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নিজের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা খাতটির সার্বিক তদারকি ও সংস্কারে কাজ করবে।
দ্বিতীয়ত: খেলাপি ঋণের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে বার্তা দিতে হবে যে, এই ধরনের অনিয়ম আর বরদাশত করা হবে না। পুনঃতফসিলের নামে সুবিধা দিয়ে বড় খেলাপিদের বাঁচানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
তৃতীয়ত: গ্রাহক সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ জরুরি। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা দিন দিন বাড়ছে। ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুত প্রতিকার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা দরকার।
চতুর্থত: ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লোকের বদলে দক্ষ ও নিরপেক্ষ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কর্মক্ষমতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়মিত মূল্যায়ন চালু করতে হবে।
পরিশেষে আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে। স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটি পর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচি চালু করে মানুষকে ব্যাংকিং সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। যাতে তারা নিজেরাই সচেতন গ্রাহক হয়ে উঠতে পারেন এবং প্রতারণার শিকার না হন।
এই সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাতের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। শুধু ব্যাংক নয় এর সঙ্গে রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকেও একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি সত্যিই জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক হয়, তবে দেশের অর্থনীতিও একটি মজবুত ভিতের উপর দাঁড়াতে পারবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির অগ্রগতি, শাখা সম্প্রসারণ কিংবা নানা নীতিগত সংস্কারের পরও যে সমস্যাটি সবচেয়ে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো—বিশ্বাসের ঘাটতি। নগর কিংবা গ্রামে, বড় ব্যবসায়ী হোক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—প্রতিটি স্তরে ব্যাংকিং সেবার প্রতি আস্থার সঙ্কট ক্রমেই বাড়ছে। এই অবিশ্বাস শুধু আর্থিক নয়, এটি গভীরভাবে নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত।
সুতরাং ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু আর্থিক কাঠামো নয় সংস্কার করতে হবে ব্যাংকের মূল্যবোধ, সেবা মান, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার জায়গাগুলোকে। প্রযুক্তি আসছে কিন্তু আস্থা ফিরছে না—এই বৈপরীত্য দূর করতেই হবে। কারণ ব্যাংক কোনো ইট-পাথরের প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি বিশ্বাসের নাম। আর সেই বিশ্বাস যদি ভেঙে পড়ে তবে অর্থনীতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ব্যাংকের ভেতর থেকে আস্থা ও নৈতিকতা পুনর্গঠন করা—যাতে ব্যাংক আবার জনগণের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

