সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। বরং চাল, ভোজ্যতেল, পরিবহন, খাবার, সেবা—প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় খাতে বাড়তি খরচের চাপ এখনো রয়ে গেছে। এখানেই তৈরি হচ্ছে কাগজে-কলমের অর্থনীতি আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অর্থনীতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান।
১১ আগস্ট সরকার জানায়, জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংখ্যাটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক খবর হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এই ঘোষণার পর স্বস্তির বদলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, আবার অর্থমন্ত্রী সরকারি হিসাবের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে বিতর্কের বাইরে গিয়ে সংখ্যাটিকে একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, কেন মূল্যস্ফীতি কমার খবর সাধারণ মানুষের কাছে তেমন স্বস্তির বার্তা হয়ে উঠছে না।
মূল্যস্ফীতি অন্য অনেক অর্থনৈতিক সূচকের মতো দূরের কোনো পরিসংখ্যান নয়। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বা বাণিজ্য ঘাটতির হিসাব সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সরাসরি অনুভব করেন না। কিন্তু মূল্যস্ফীতির প্রভাব অনুভূত হয় প্রতিটি বাজারে, প্রতিটি রান্নাঘরে এবং প্রতিটি পরিবারের মাসিক বাজেটে। চাল কিনতে গিয়ে, রান্নার তেল কিনতে গিয়ে কিংবা বাসভাড়া দিতে গিয়ে মানুষ বুঝতে পারেন জীবনযাত্রার ব্যয় আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার, বাসস্থান, যাতায়াত ও অন্যান্য অপরিহার্য খাতে চলে যায়। আয় কমে গেলে বা ব্যয় বেড়ে গেলে তাদের হাতে বিলাসী খরচ কমানোর সুযোগও থাকে না। ফলে মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাব আর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকলে সেটি খুব দ্রুত মানুষের নজরে পড়ে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থ দাম কমে যাওয়া নয়। জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা নেমে হয়েছে ৮.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যের দাম কমেনি; বরং আগের তুলনায় কিছুটা ধীর গতিতে বেড়েছে। সহজভাবে বললে, দাম বাড়ার গতি কমেছে, কিন্তু দাম বাড়া বন্ধ হয়নি।
এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজারে কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও সেই দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ফলে একজন ভোক্তার জন্য মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ তখনই স্বস্তিদায়ক হবে, যখন তার আয় বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রকৃত দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সরকারের নিজস্ব ভোক্তা মূল্যসূচকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোক্তা মূল্যসূচক মূলত একজন সাধারণ ভোক্তা যে পণ্য ও সেবা ব্যবহার করেন, সেগুলোর দামের সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন পরিমাপ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মূল্যসূচক ও মূল্যস্ফীতি হিসাব করতে গ্রাম ও শহর মিলিয়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত ৭৪৯ ধরনের পণ্য ও সেবার ৩৮৩টি উপাদানের দাম সংগ্রহ করে।
এই হিসাব অনুযায়ী, জুনে ভোক্তা মূল্যসূচক ছিল ১৪৬.১১। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১৪৮.২১। আর জুলাই ২০২৫-এ এই সূচক ছিল ১৩৬.৮৩। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সূচক বেড়েছে ১১.৩৮ পয়েন্ট। শুধু জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই দাম বেড়েছে ১.৪৪ শতাংশ, যা গত বছরের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ মাসভিত্তিক বৃদ্ধি।
তাই মূল্যস্ফীতির ৮.৩২ শতাংশ হারকে একা দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। বরং একই সঙ্গে ভোক্তা মূল্যসূচকের পরিবর্তন দেখলে বোঝা যায়, বাজারে দামের চাপ এখনো কতটা শক্তিশালী।
সময়ের হিসাব বদলালেও ছবিটা কিছুটা পরিবর্তিত হয়। জুলাইয়ের ৮.৩২ শতাংশ হলো গত বছরের জুলাইয়ের সঙ্গে তুলনা করে পাওয়া এক বছরের ব্যবধানের হিসাব। অন্যদিকে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৬৬ শতাংশে। দীর্ঘ সময়ের এই গড় হিসাব মাসভিত্তিক ওঠানামার প্রভাব কিছুটা কমিয়ে দেয়। ফলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এক মাসের পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি স্থায়ী—এমন একটি চিত্র এতে পাওয়া যায়।
জুলাইয়ে খাদ্যবহির্ভূত কয়েকটি খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে। পরিবহন খাতে মূল্যস্ফীতি জুনের ১০.১০ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৯.৩৪ শতাংশে নেমেছে। তবে হারটি এখনো ১০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ পরিবহন ব্যয়ের চাপ কমলেও তা স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি।
যোগাযোগ খাতে অবশ্য মূল্যস্ফীতির গতি তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। জুনে এই খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৭৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ে নেমে এসেছে ৬.৯০ শতাংশে। বিনোদন ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে সব খাতের চিত্র এক নয়। কিছু সেবা খাতে বরং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রেস্তোরাঁ ও হোটেল। জুনে এই খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৭০ শতাংশ। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১২.৫৭ শতাংশ। শুধু তাই নয়, জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এ খাতে মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১.৬১ শতাংশ।
এর অর্থ হলো, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ার একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমলেও সেবার ক্ষেত্রে মানুষের ব্যয় কমার নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না।
খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে ‘বিবিধ পণ্য ও সেবা’ বিভাগটিও বড় ধরনের চাপের জায়গা হয়ে আছে। জুনে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪.৯৮ শতাংশ। জুলাইয়ে সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.৪৯ শতাংশে। কিন্তু কমার পরও এটিই খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির হার।
অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গড় সময়ে এই বিভাগের মূল্যস্ফীতি যে সর্বোচ্চ ১৮.৯০ শতাংশে উঠেছিল, তার তুলনায় জুলাইয়ের ১৪.৪৯ শতাংশ কিছুটা স্বস্তির খবর। কিন্তু সাধারণ ভোক্তার জন্য ১৪.৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতিও যে বড় ধরনের চাপ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে মানুষের আয় নিয়ে। সরকারের প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হিসাবও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় মজুরি বেড়েছে মাত্র ৮.২২ শতাংশ। অথচ একই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৩২ শতাংশ।
অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এর সরাসরি অর্থ হলো, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখনো কমছে। একজন মানুষের বেতন বা মজুরি যদি বছরে ৮.২২ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম গড়ে ৮.৩২ শতাংশ বাড়ে, তাহলে আগের বছরের তুলনায় একই আয় দিয়ে সে কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারবে।
এখানেই মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাব এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্যটি সবচেয়ে পরিষ্কার হয়। মূল্যস্ফীতির হার কমেছে—এটি পরিসংখ্যানগতভাবে সত্য হতে পারে। কিন্তু সেই কমার হার যদি মানুষের আয় বৃদ্ধির চেয়েও বেশি থাকে, তাহলে তাদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসবে না।
বরং দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের সঞ্চয় কমে যেতে পারে, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে মানুষকে অন্য ব্যয় কমিয়ে দিতে হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই চাপ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
তাই জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির হিসাবকে এক কথায় ভালো বা খারাপ বলে বিচার করলে পুরো বাস্তবতাটি ধরা পড়বে না। একদিকে ৯.১৬ শতাংশ থেকে ৮.৩২ শতাংশে নেমে আসা মূল্যস্ফীতি কিছুটা ইতিবাচক সংকেত। এটি অন্তত দেখাচ্ছে যে দামের ঊর্ধ্বগতির গতি কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে ভোক্তা মূল্যসূচক জুনের ১৪৬.১১ থেকে জুলাইয়ে ১৪৮.২১-এ উঠে যাওয়া এবং মাসভিত্তিক ১.৪৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি জানিয়ে দিচ্ছে, বাজারে দাম এখনো বাড়ছে।
একই সঙ্গে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬৬ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি ৮.২২ শতাংশ—এই দুটি তথ্যও দেখাচ্ছে যে মানুষের আয় এখনো জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারছে না।
সুতরাং মূল্যস্ফীতি কমার খবরকে স্বস্তির সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এটিকে সংকট শেষ হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দামের গতি কমানোর পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক শুধু সরকারি প্রতিবেদনের একটি সংখ্যা নয়। একজন পরিবার মাস শেষে একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কতটা খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে পারছে—সেটিও অর্থনীতির বাস্তব স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
জুলাইয়ের ৮.৩২ শতাংশ তাই নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। কিন্তু এর অর্থ বুঝতে হলে সেই সংখ্যার পাশাপাশি ১৪৮.২১ ভোক্তা মূল্যসূচক, ৮.৬৬ শতাংশ ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি এবং ৮.২২ শতাংশ জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির দিকেও তাকাতে হবে। কারণ কাগজে দামের বৃদ্ধির গতি কমে গেলেও মানুষের আয় যদি তার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে অর্থনীতির পরিসংখ্যানগত উন্নতি সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি হিসেবে ধরা দেবে না।

