বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন এখন যেন এক দীর্ঘসূত্রতার গল্প। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প এক দশকেও শেষ হয়নি। মেয়াদ বাড়ছে, ব্যয়ও বাড়ছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি প্রশ্নবিদ্ধ।
রেলওয়ের ৩১টি চলমান প্রকল্প বিশ্লেষণে উঠে এসেছে হতাশাজনক এক চিত্র। কোথাও কাজ এগিয়েছে ৮০ শতাংশ, কোথাও মাত্র ৮ শতাংশ। এমনকি কিছু প্রকল্পের কাজ এখনও শুরুই হয়নি।
সরকারি নথি বলছে, প্রকল্পগুলোর মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৩১ হাজার ৫০৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৮৩ হাজার ৬৩ কোটি ৬২ লাখ এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ৪৪৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি)-তে দেখা যাচ্ছে, রেলওয়ের জন্য বরাদ্দ ১০ হাজার ২২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা। মার্চ পর্যন্ত এই বরাদ্দের মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
কেন এত ধীরগতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই, মাস্টারপ্ল্যানের ত্রুটি, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং বিদেশি অর্থ ছাড়ে বিলম্ব—সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে চলছে চরম গাফিলতি।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটারগেজ লাইনের সঙ্গে ডুয়েলগেজ যুক্ত করার প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল ২০১০ সালে। তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকৃত নির্মাণকাজ শুরু হয় ছয় বছর পর।
বারবার বাড়ছে মেয়াদ
৩১টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ১৩টির মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। অনেক প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি হয়েছে দুই বা তিনবার। যেমন:
- দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্পে ২ দফা
- খুলনা-মোংলা প্রকল্পে ৩ দফা
- পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেট উন্নয়ন প্রকল্পে যথাক্রমে ৩ ও ২ দফা
- পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ২ দফা
- আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্পে ১ দফা
এছাড়া, গত বছরই ৯টি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা চলমান।
কোন প্রকল্পে কত বরাদ্দ?
অর্থের অঙ্ক বিশাল কিন্তু বাস্তবায়নের চিত্র প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ:
- পদ্মা সেতু রেল সংযোগ: ৩৮,৬২৪ কোটি টাকা
- যমুনা রেল সেতু: ১৬,৭৮০ কোটি টাকা
- জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েলগেজ: ১৪,২৫০ কোটি টাকা
- দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম: ১১,৩৩৫ কোটি টাকা
- চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডুয়েলগেজ: ১০,৭৯৭ কোটি টাকা
- রেল রোলিং স্টক উন্নয়ন: ৩,৬০২ কোটি টাকা
- খুলনা-মোংলা রেলপথ: ৪,২২৫ কোটি টাকা
- কুলাউড়া-শাহবাজপুর পুনর্বাসন: ৬৭৮ কোটি টাকা
- জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী নতুন প্রকল্প: ১৬৬ কোটি টাকা
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভারতের প্রতিশ্রুত অর্থায়নে পাঁচটি প্রকল্প এখনও চলছে। কিন্তু ভারত অর্থ ছাড়ে দেরি করছে। ফলে সরকার এখন বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?
রেলওয়ের প্রকল্প মহাব্যবস্থাপক ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, প্রকল্পভেদে সমস্যা ভিন্ন। অনুমোদনের পর কাজ শুরুর আগে ও চলাকালে বিভিন্ন জটিলতা আসে। প্রকল্প পরিচালকরা প্রকৃত কারণ ভালো বলতে পারবেন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, “যত দেরিতে প্রকল্প শেষ হয়, ততই মূল সম্ভাব্যতার সঙ্গে মিল হারায়। সময়মতো শেষ হলে বিনিয়োগের রিটার্ন পাওয়া যেত। এখন তা অনিশ্চিত।”
তিনি বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা বন্ধ না করলে কোনো প্রকল্প সময়মতো শেষ হবে না।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান মো. নাজমুল হাসান বলেন, “ভূমি অধিগ্রহণ, বৈদেশিক অর্থ ছাড় এবং যাচাই-বাছাইয়ের জটিলতা মিলিয়ে প্রকল্পে দেরি হচ্ছে।”

