প্রতি বছরের বাজেট ঘোষণার আগে দেশের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এক ধরনের স্বাভাবিক কৌতূহল তৈরি হয়। সরকার কেমন বাজেট ঘোষণা করবে—এ প্রশ্ন ঘিরেই নানা আলোচনা জমে ওঠে।
এক সময়, বিশেষ করে ৮০’র দশকে, বাজেট ঘোষণার দিনটি আলাদা গুরুত্ব পেত। লেখকের স্কুলজীবনের স্মৃতিতে তখন দেখা যায়, “আজ বাজেট ঘোষণা হবে”—এই খবরেই এলাকায় এক ধরনের আলোড়ন তৈরি হতো। বাজারের বড় চায়ের দোকানগুলোতে মানুষ ভিড় করত। সবাই মাথা উঁচু করে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকত গভীর আগ্রহ নিয়ে।
তখন বাজেট শোনা হতো মূলত বিটিভির মাধ্যমে। সরকারের ভালো-মন্দ নিয়ে টুকটাক আলোচনা চলত সাধারণ মানুষের মধ্যে। সেই সময়ের বাজেট সংক্রান্ত খবর ঘিরে শুধু একটি শ্রেণি নয়, সমাজের নানা স্তরের মানুষ যুক্ত থাকতেন। শিক্ষক, কৃষক, মুদি দোকানদার, চা বিক্রেতা, রিকশাচালক ও কৃষিশ্রমিক—সবাই বাজেটকে নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করতেন।
লেখকের শৈশব ছিল খুবই ছোট বয়সে। তখন টেলিভিশন দেখা নয়, বরং মানুষের বাজেট-আগ্রহ দেখাই বেশি কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠত। গ্রামের পাঠশালায় কাটানো বছরগুলোতেও এই চিত্র প্রায় একই ছিল—মানুষের মধ্যে বাজেট নিয়ে অপেক্ষা ও আলোচনার একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ত। সময় এগিয়েছে। লেখক শহরে এসে কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও একই চিত্রের বিস্তার আরও বড় আকারে দেখতে পান। তখন ধীরে ধীরে প্রশ্ন জাগে—মানুষ কেন বাজেট নিয়ে এত আগ্রহী? কেন এত আলোচনা?
পরবর্তীতে বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বোঝা যায়, বাজেট শুধু একটি আর্থিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং মানুষের জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বাস্তব বিষয়। এই কারণে গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে শুরু করে শহরের বড় অট্টালিকার মানুষ পর্যন্ত, শ্রমিক থেকে মালিক—সবাই নিজেদের জীবনে বাজেটের প্রভাব অনুভব করেন।
বর্তমানে বাজেট ঘোষণার সময় আগের মতো সবাই টেলিভিশনের সামনে বসে না থাকলেও আগ্রহ একটুও কমেনি। বরং বাস্তবতার সঙ্গে সেই আগ্রহ আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে। বাজেট নিয়ে এখন নানা মহলে আলোচনা হয়—সংসদ থেকে চায়ের দোকান, মাঠের আড্ডা থেকে খাবার টেবিল, আবার প্রেস ক্লাবের সেমিনার থেকে টেলিভিশনের সংবাদ কক্ষ পর্যন্ত।
এখানে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, মতবিনিময় ও বিতর্কও চলে। তবে এসব আলোচনার মাঝেও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—নিরীহ করদাতাদের প্রত্যাশা কী? তারা মূলত জানতে চান, বাজেটে কোনো খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে কি না, করযোগ্য আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে কি না, কিংবা করহার পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—এমন বিষয়গুলোই তাদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
করদাতাদের আগ্রহের কথাগুলো নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এই বছর কেমন প্রস্তাব পেলেন করদাতারা, ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার জন্য বাজেটে যা প্রস্তাবনা রয়েছে:
০১. চলতি অর্থবছরের বার্ষিক আর্থিক ঘোষণাপত্রে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সুবিধা শুধু ২০২৬–২৭ করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট এই সময়ের মধ্যেই করদাতারা নতুন সীমার আওতায় সুবিধা পাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে সাধারণ করদাতারা কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পাবেন। তবে করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট গবেষণা করা হয়েছে কি না, তা প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ভিত্তি নিয়ে কিছু প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
০২. চলতি বাজেট প্রস্তাবে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের পাশাপাশি বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। একইভাবে তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা এবং গেজেটভুক্ত গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়িয়ে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতা, পিতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও কর সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তাদের প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য নির্ধারিত করমুক্ত সীমার সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া বাজেট প্রস্তাবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে নির্ধারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৮–২৯ এবং ২০২৯–৩০ করবর্ষে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা। আর ২০৩০–৩১ করবর্ষে তা বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমে কর কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট রূপরেখার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কর হার:
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর করহার ০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ কর ধার্য করার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর ধার্য করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া করদাতাদের রিটার্ন জমা প্রক্রিয়ায়ও নতুন কাঠামো আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হলেও এটি চারটি কোয়ার্টারে বিভক্ত করে নির্দিষ্ট শর্তের আওতায় পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম কোয়ার্টার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ ছাড় পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় কোয়ার্টার অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে মোট প্রদেয় কর সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করতে হবে এবং কোনো ছাড় প্রযোজ্য হবে না।
তৃতীয় কোয়ার্টার জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে মোট করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ এই ধাপে ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।
চতুর্থ কোয়ার্টার এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে মোট করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে করদাতারা নিজেদের সুবিধামতো সময় বেছে নিয়ে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকে একে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে বাজেট প্রস্তাবনায় ব্যাংক হিসাব খোলা বা সচল রাখতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যেমন কৃষক, শ্রমিক, বিধবা নারী বা স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তারা বলছেন, অনেকের আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে তাদের টিআইএন নিতে বাধ্য করা হলে এটি অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি টিআইএন গ্রহণ ও বন্ধ করার প্রক্রিয়া সহজ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য এটি ঝামেলার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসায়িক হিসাবের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা তুলনামূলকভাবে যৌক্তিক হতে পারে, তবে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। সামগ্রিকভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য থাকলেও সেই প্রক্রিয়া যেন সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।

