রাজধানীবাসীর ভোগান্তি কমানো এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এবার ঢাকায় বিদ্যুৎচালিত বাস নামানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য প্রায় ২৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বায়ুর গুণগত মান উন্নয়ন এবং পরিবহন খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানো। এর মাধ্যমে ঢাকার দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধান করার কথা বলা হয়েছে।
নগরবাসীর অনেকে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এমন উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করেন, পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের সঙ্গে নতুন বাস একসঙ্গে চলা বেমানান। তাই নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে রাজধানীর গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি।
পুরোনো বাস ধাপে ধাপে সরানোর পরিকল্পনা:
সরকার রাজধানীর পুরোনো ও লক্করঝক্কর বাস পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব বাস অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন বাস চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, হঠাৎ করে সব পুরোনো বাস সরানো সম্ভব নয়। এতে বাস মালিকদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন আনা হবে। তিনি আরও বলেন, মানুষ যখন আধুনিক পরিবহন সুবিধা পাবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুরোনো বাস ব্যবহারে আগ্রহ কমে যাবে। তিনি জানান, লক্করঝক্কর বাস চলাচলে কড়াকড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়েও সরকার চিন্তাভাবনা করছে।
জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে রাজধানীর পুরোনো বাস ধাপে ধাপে বিদ্যুৎচালিত বাস দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।
প্রকল্পে কী থাকছে:
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৪০০টি বিদ্যুৎচালিত বাস কেনা হবে। এসব বাস চলবে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে। বাস পরিচালনা করবে অপারেটরভিত্তিক ব্যবস্থাপনা।
এ জন্য তিনটি চার্জিং ডিপো নির্মাণ করা হবে। পূর্বাচলে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ১ দশমিক ৩ একর জায়গায় চার্জিং স্টেশনসহ একটি ডিপো হবে। সেখানে বাস রাখা হবে। দ্বিতীয় ডিপো হবে রাজউকের ঝিলমিল এলাকায়। তৃতীয়টি কাঁচপুরে করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নীতিমালা প্রণয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বুদ্ধিমান পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি সহায়তা থাকবে। প্রকল্পটি পরিবেশদূষণ রোধ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো এবং টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, বায়ুমান উন্নয়ন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, যানজট হ্রাস, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১৩৫ কোটি টাকা আসবে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে। বাকি ৩৬৫ কোটি টাকা দেবে সরকার। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় বিদ্যুৎচালিত বাস চালু করা হবে। এতে গণপরিবহনের মান উন্নয়ন, যানজট কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাসগুলোতে স্বয়ংক্রিয় দরজা খোলা–বন্ধ, ই-টিকেটিং ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত রুট নম্বর থাকবে। একই কোম্পানির বাসের রং একরকম হবে এবং কাউন্টারভিত্তিক সেবা চালু হবে।
বিভিন্ন সরকার আগে রাজধানী থেকে পুরোনো বাস সরানোর উদ্যোগ নিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। অনেকে এর পেছনে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশকে দায়ী করেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের মধ্যে ১৬ হাজার ১৯৮টি মেয়াদোত্তীর্ণ। মোট নিবন্ধিত বাস প্রায় ৫৪ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ বাসের বয়স ২০ বছরের বেশি। তবে কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। কারণ প্রতিদিনই নতুন যানবাহনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে এবং অনেকের ফিটনেস সনদও হালনাগাদ নেই।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, পুরোনো বাস রাজধানীর সৌন্দর্য নষ্ট করছে এবং যানজট বাড়াচ্ছে। বিদ্যুৎচালিত বাস চালুর উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান। তবে তার আগে পুরোনো বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আগের মতোই সরকার বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করলেও যাত্রীদের মতামত উপেক্ষিত থাকে। তিনি বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিক লোক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।

