বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কাছে দেশের শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকা তুলে ধরে। এই তালিকায় দেখা গেছে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান‘ইউনাইটেড অ্যারাবিয়ান অ্যামিরেটস ‘ট্রেডিং’ (ইউনাইটেড গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান) একাই খেলাপি ৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড।
এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চৌধুরী গ্রুপ, যাদের খেলাপি ২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা আরএমএম গ্রুপ খেলাপি ২ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে টিআরএল গ্রুপ, বিআইএফসি (বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি), বেক্সিমকো গ্রুপ, হাফিজ গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, ডেল্টা গ্রুপ, ম্যাক্স গ্রুপ ও মোজাম্মেল হক গ্রুপ। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বহু বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেলেও ঋণ পরিশোধ করেনি। কেউ কেউ আবার পরিশোধে অনাগ্রহ দেখিয়ে পুনঃতফসিল, ছাড় ও আদালতের সহায়তায় বারবার সময় নিয়েছে।
রাজনীতি ও প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে টিকে থাকা ঋণখেলাপিরা:
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যারা শত শত কোটি টাকা নিয়ে খেলাপি হয়েছে, তাদের অনেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। ফলে বছরের পর বছর ঋণ ফেরত না দিলেও তারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আবারও ঋণ সুবিধা পেয়েছে।
বাংলাদেশে ঋণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া যেমন দীর্ঘ ও জটিল, তেমনি ব্যাংক ও প্রশাসনের দুর্বলতাও তাদের সহায়তা করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারাই কমিশন কিংবা সুবিধা নিয়ে প্রভাবশালী খেলাপিদের সহায়তা করেছেন। আবার কিছু খেলাপি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে প্রভাব বিস্তার করেছে ব্যাংক ও আদালতের ওপর। এ প্রসঙ্গে এক ব্যাংক বিশ্লেষক বলেন, “খেলাপিরা শুধু অর্থনীতি নয়, আইনের শাসন ও নৈতিকতাকেও ধ্বংস করছে। যারা ১০ বছর ধরে কোনো কিস্তি না দিয়েও ব্যাংকের বোর্ডে থাকেন, তারা আসলে গোটা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছেন।
খেলাপির তালিকা বড় হচ্ছে, দায় নিতে কেউ প্রস্তুত নয়:
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০০ খেলাপির কাছেই আছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অর্থাৎ মাত্র ১০০ জন প্রতিষ্ঠানের কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় একটি অংশের তারল্য চাপে পড়েছে। এই খেলাপিদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভবিষ্যতে সমস্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিদ্যমান আইনি কাঠামো, আদালতের ধীরগতি, এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংক খাতকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
দায় এড়ানোর প্রবণতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব:
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক সময়েই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তা দেখা যায় না। বরং যেসব ব্যাংক বড় খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল করে সুবিধা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে কেবল তালিকা প্রকাশ নয়, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া তা সম্ভব নয়। কারণ, খেলাপিদের বড় একটি অংশই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

