যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ। এগুলো জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য কেনা হবে। সরকারের লক্ষ্য, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক কমানো এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।
এটাই হবে বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিমান ক্রয়ের উদ্যোগ। যদিও এখনো প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানে না। বিমান জানায়, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো নির্দেশ বা চুক্তির কপি আসেনি।
বিশাল বহর তবে দুর্বল ভিত্তি
বিমান বাংলাদেশ এখনো লাভজনক ধারায় স্থিত নয়। অনেক রুটে যাত্রীসংখ্যা কম, ফলে ফ্লাইট পূর্ণ হয় না। তবু বিশাল বহরের এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব উড়োজাহাজের জন্য বিমানকে বড় অর্থনৈতিক দায় নিতে হবে, সেই সংস্থাকে অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। ফ্লিট প্ল্যানিং, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারের কৌশল ছাড়াই এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানান- বিমান বহর বাড়ানো সরকারের আগের পরিকল্পনাতেই ছিল। তবে সাম্প্রতিক পাল্টা শুল্ক পরিস্থিতির কারণে ১৪টি থেকে অর্ডার বাড়িয়ে ২৫টি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া সবাই বোয়িংয়ের কাছে বড় অর্ডার দিচ্ছে। অর্ডার পেতে সময় লাগে। কিছু উড়োজাহাজ আগামী দু-এক বছরের মধ্যে এসে যেতে পারে।”
এই ক্রয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির একটি চুক্তিও হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক এ বি এম রওশন কবীর বলেন, “আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না। এখনো কোনো অফিসিয়াল নোটিশ আসেনি।”
বিমানের সাবেক বোর্ড সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন- “যারা ঋণ শোধ করবে, তারাই যদি না জানে কতগুলো উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তাহলে সেটি দুর্ভাগ্যজনক। বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিমানের অংশগ্রহণ জরুরি ছিল।”
তিনি জানান, ২০০৮ সালে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সময় বোর্ড ও ফ্লিট প্ল্যানিং কমিটি বিশদ মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেয়। দর-কষাকষি করে বাড়তি সুবিধাও আদায় করা হয়েছিল।
বোইংয়ের তালিকামূল্য অনুযায়ী, ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারের দাম ২৯২ মিলিয়ন ডলার এবং ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের দাম ১২১.৬ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের পরিকল্পনায় রয়েছে ১০টি ড্রিমলাইনার ও ১৫টি ম্যাক্স, যার মোট দাম দাঁড়ায় প্রায় ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার (৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি)। যদিও বড় অর্ডারে সাধারণত ২০-৩০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায়।
অর্থ আসবে কোথা থেকে?
সূত্র জানায়, অর্থায়ন হবে বিদেশি ব্যাংক ঋণ, ইউএস এক্সিম ব্যাংকের সহায়তা ও সরকারের আংশিক ভর্তুকি থেকে। কিন্তু এত বড় ঋণ শোধে বিমানের সক্ষমতা কতটা আছে, তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, যাত্রী বা রুট না বাড়িয়ে শুধু ঋণ নেওয়া ভবিষ্যতে বিমানের জন্য ‘ঋণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে ২৩টি আন্তর্জাতিক ও ৮টি অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চালায়। এ ছাড়া আছে মালবাহী কার্গো সার্ভিস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ক্যাটারিং ও পোলট্রি ইউনিট।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে বিমানের আয় ১০ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ২৮২ কোটি টাকা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুনাফা ৮০০ কোটি ছাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানের প্রকৃত আর্থিক চিত্র স্পষ্ট নয়। লাভ হচ্ছে মূলত বিমান বহির্ভূত ব্যবসা থেকে। এর ফলে বিমান লাভজনক দেখালেও এর মূল এয়ারলাইনস অপারেশন সংকটে রয়েছে।
বর্তমানে বিমানের বহরে আছে ২১টি উড়োজাহাজ। নতুন ২৫টি আসলে বছরে ৪০০–৫০০ বাড়তি ফ্লাইট চালাতে হবে। অথচ প্রতিষ্ঠানে পাইলট, প্রকৌশলী, ক্রু—সবই সংকটপূর্ণ।
বিমানের যাত্রীসংখ্যা গড়ে বছরে ৪–৬ শতাংশ বাড়লেও তা দিয়ে বিশাল বহরের খরচ চালানো কঠিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঢাকতে বহর বাড়ালে সেটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
নতুন বিমান মানেই নতুন চাপ?
বিমানের সাবেক পরিচালক বলেন, “পর্যাপ্ত ফ্লাইট অপারেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট, পার্টনারশিপ ছাড়া নতুন উড়োজাহাজ কেবল চাপ বাড়াবে। যত উড়োজাহাজই আসুক, যদি তা নিয়মিত উড়তে না পারে, যাত্রী না পায়, রুট না খোলা হয়, তাহলে সেগুলো হয়ে যাবে অলস সম্পদ।”
বর্তমানে বিমানের লোড ফ্যাক্টর ৬৫–৭০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ফ্লাইটে গড়ে এক-তৃতীয়াংশ আসন ফাঁকা থাকে। এ ছাড়া বহু উড়োজাহাজ অলস পড়ে আছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট ছাড়া দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলো এখনো বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযুক্ত নয়।
পুরনো ঋণ এখনো বাকি
২০০৮–২০১৪ সালের মধ্যে কেনা ১০টি বোয়িং বিমানের প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এখনো পরিশোধ হয়নি। এখন আরও ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা বিমানকে অর্থনৈতিকভাবে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

