দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করেছে। প্রায় সাড়ে চার বছর পর মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়িয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১০৩ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তবে রিজার্ভের হিসাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মোট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত পদ্ধতিতে আরেকটি হিসাবও তুলে ধরা হয়। সেই হিসাবে, বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী দেশের রিজার্ভ বর্তমানে ৩১ হাজার ৫৫২ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২৩ জুন দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৫ হাজার ৭৯৮ দশমিক ১১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভ বৃদ্ধি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় মেটানো, মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও সহজ ছিল না। ২০২২ সালের অক্টোবরের পর থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধারাবাহিক চাপ দেখা দেয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে শুরু করে।
এক সময় ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ওপরে থাকা রিজার্ভ ক্রমশ কমে ২০২৪ সালের আগস্ট নাগাদ ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে তা আরও কমে ২৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। ওই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন ঘটে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকারের পরিবর্তন হয় এবং নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে।
অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহ এবং ডলার ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের ফলে রিজার্ভ আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতার ফল হিসেবে বর্তমানে রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য অবশ্যই ইতিবাচক সংকেত। তবে শুধু রিজার্ভ বাড়লেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ এবং স্থিতিশীল ডলার বাজার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি দেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক একটি বার্তা। দীর্ঘ পতনের পর রিজার্ভের ধারাবাহিক উত্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখাই হবে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

