গত বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার দেশের কৃষি খাত লইয়া যে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন, উহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমকাল অনলাইনের এক প্রতিবেদন অনুসারে, রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সতর্কবার্তা জারির ন্যায় বলেন– আমেরিকানরা আমাদের কৃষি খাত দখলে লইতে চাহিতেছে।
তিনি বলিয়াছেন, ‘আমার মন্ত্রণালয় যেহেতু কৃষি মন্ত্রণালয় নহে, আমি এই বিষয়ে কিছু করিতে পারিতেছি না। কিন্তু আমেরিকানদের সহিত যতই কথাবার্তা হইতেছে, দেখা যাইতেছে; তাহাদের জিএমও আনিবার জন্য কৃষিকে উহারা দখলে লইবে এবং কোম্পানিগুলি চলিয়া আসিবে।’ উপদেষ্টার এই বক্তব্যে অন্তত দুইটা উদ্বেগজনক বিষয় উঠিয়া আসিয়াছে বলিয়া আমরা মনে করি। একটা হইল, আমেরিকানরা প্রায় জোর করিয়া আমাদের কৃষিতে তাহাদের কোম্পানিগুলির অনুপ্রবেশ ঘটাইবে, যথায় আমাদের সার্বভৌমত্ব জড়িত। অপরটি হইল, এইখানে কৃত্রিম উপায়ে বিভিন্ন শস্যে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট খাদ্যপণ্যের প্রচলন ঘটাইবে, যাহার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি লইয়া বৈজ্ঞানিক মহলে প্রচুর উদ্বেগ বিদ্যমান। এবম্বিধ কারণে তাহার বক্তব্যকে যদ্রূপ লঘুরূপে গ্রহণের সুযোগ নাই, তদ্রূপ উক্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরম্ভ করাও জরুরি।
আমরা জানি, বাংলাদেশে ২০১৪ সালে প্রথম বিটি বেগুন চাষাবাদের মাধ্যমে জিএমও খাদ্য উৎপাদনের যাত্রা শুরু। বিটি বেগুন অধিক উৎপাদনশীল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হইবার কথা সরকারের পক্ষ হইতে বলা হইলেও উহার পরীক্ষামূলক চাষাবাদ খুব একটা সফল হয় নাই। তথাপি জিএমও খাদ্য প্রচলনের প্রয়াস যে বন্ধ হয় নাই, মৎস্য উপেদষ্টার আলোচ্য বক্তব্যই তাহা প্রমাণ করে।
পরিহাস হইল, গণআন্দোলনে বিগত সরকার বিদায় লইবার পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করিলেও অনেক ক্ষেত্রেই শেষোক্তগণ পূর্বোক্তদের দুর্ভাগ্যজনক ধারাবাহিকতা রক্ষা করিয়া যাইতেছেন। যদি এখানে আমেরিকানরা প্রকৃতই জিএমও খাদ্য উৎপাদনের অনুমতিপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইবে এই ক্ষেত্রে নূতন সংযোজন। অথচ বিগত সরকারের নেতিবাচক সকল কিছু বর্জন করাই ছিল এই সরকারের অঙ্গীকার। পরিসংখ্যানগত দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমগ্র বিশ্বে জিএমও খাদ্য উৎপাদনের হার ক্রমবর্ধমান। প্রধানত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সহিত খাদ্য উৎপাদনের গতি সমান রাখিবার অজুহাত দিয়াই জিএমও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা হইতেছে। এইখানে আমেরিকান কোম্পানিসমূহেরও যে ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রবলভাবে সংশ্লিষ্ট, তাহাও উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান বিশ্বে জিএমও খাদ্য বাণিজ্যে সর্বাধিক মার্কিন কোম্পানি সংশ্লিষ্ট। প্রসঙ্গত, বর্তমানে প্রতিবেশী ভারতের সহিত যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক লইয়া যে টানাপোড়েন চলমান, তাহার অন্যতম প্রধান উৎস ভারতের কৃষি খাতে মার্কিন কোম্পানিসমূহের প্রবেশাধিকার। ভারত কিছুতেই তাহার বিশাল কৃষি খাতে অন্য দেশের প্রবেশাধিকার দিবে না। অপরদিকে মার্কিন প্রশাসনের দাবি– তাহাদের কোম্পানির জন্য উক্ত খাত উন্মুক্ত করিয়া দিতে হইবে। ইহা হইলে শুধু কোটি কোটি ভারতীয় কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে না; ভারতের ভাষ্য– তাহার ১৪০ কোটি মানুষের নূতন প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকিও সৃষ্টি হইবে। ভারতে বর্তমানে মাত্র ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে জিএমও বীজ ব্যবহৃত হয়।
জিএমও খাদ্য ভক্ষণে মানবদেহে নানা প্রকার রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। উহার ফলে মানবদেহে অন্তত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, যাহা গবেষণালব্ধ। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত শস্য কর্তৃক পরাগায়নের মাধ্যমে অন্য শস্য বা জীব ধ্বংস হইবার আশঙ্কা থাকে। ফলে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় ফুৎকারে উৎক্ষেপ করিয়া যায় না।
খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর তথ্য অনুযায়ী, জিএমও খাদ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাক্ত উপাদান তৈরি হওয়ায় দীর্ঘদিন ঐ খাদ্য গ্রহণে মানবদেহে বিষাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। তাই এফডিএর সুপারিশ হইল, জিএমও খাদ্য বাজারজাতকরণের পূর্বে দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ততার ব্যাপারে পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। দেখা যাইতেছে, জিএমও খাদ্য ভক্ষণে খাজনা অপেক্ষা বরং বাজনাই অধিক। তাই আমরা সরকারকে এই বিষয়ে সচেতন থাকিবার আহ্বান জানাই।
সূত্র: সমকাল

