দেশের আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় বোঝা এখন খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চামড়া, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙার মতো উৎপাদনমুখী শিল্প। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে রুগ্ণ অবস্থায় পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০.২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
উৎপাদনমুখী শিল্পখাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি করে। এই খাতের ঋণের পরিমাণও সবচেয়ে বেশি। মোট ঋণের ৪৯.২৮ শতাংশ এ খাতে বিতরণ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণের হারও সর্বোচ্চ এ খাতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট খেলাপি ঋণের ৪৯.৪৩ শতাংশ এখন উৎপাদনমুখী শিল্পে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংকগুলো কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখতে পারত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এ ক্ষেত্রে উদার ছিল। আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হওয়ার পর খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার সংস্কৃতি অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের অতীত ক্ষত স্পষ্ট হয়েছে।
এ তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেও প্রতিফলিত। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনে ব্যাংক খাতে আরও ১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুনের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি। যেখানে ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, উৎপাদন খাত অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি অনেকদিন ধরে উচ্চ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিক্রি কমায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ ও ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানি কম হয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৫০ শতাংশে সীমিত ছিল। এসব সংকট খেলাপি ঋণ বাড়িয়েছে।’
মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘কিছু ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে। অনেক ঋণ উৎপাদনমুখী শিল্পের নামে নেয়া হলেও দেশে বিনিয়োগ হয়নি। এ কারণে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে।’ দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ৪৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। এটি খাতের বিতরণকৃত ঋণের ২৫.৮৩ শতাংশ। উৎপাদনমুখী বস্ত্র খাতেও বিতরণকৃত ঋণের ২৪.৪৮ শতাংশ এখন খেলাপি, অর্থমূল্যে ৩৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।
তৈরি পোশাক খাতের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিকে খাত সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগজনক মনে করছেন। এর পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ আছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অর্ডার বাতিল বা বিলম্বে অর্থ প্রদান করেছে। এর প্রভাব পড়েছে নগদ প্রবাহে। অভ্যন্তরীণ খরচ ও নীতিসংক্রান্ত সংকটও সমস্যা বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চিত সরবরাহ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। কিছু উদ্যোক্তার দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট শৃঙ্খলার অভাবও সমস্যা জটিল করেছে।
পোশাক খাতের কাঁচামাল সরবরাহকারী বস্ত্র খাতেও একই সমস্যা দেখা গেছে। অর্ডার কমায় নগদের ঘাটতি, ডলার 대비 টাকার অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট—সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। উৎপাদন খাতের খেলাপি ঋণ শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে বা বন্ধ হয়েছে। হাজারো শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন বা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ব্যাংক খাতেও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। প্রকৃত সমস্যায় পড়া উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃতফসিল ও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। উদ্দেশ্যমূলক খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ঋণ অনুমোদনের আগে প্রকল্প যাচাই ও জামানত মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কাঁচামাল আমদানি ও জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করলে খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘খাত যত বড়, ঋণও বেশি হবে। খেলাপি ঋণ এখন জাতীয় ইস্যু। প্রকৃত ব্যবসায়ী সঠিকভাবে ঋণ পরিচালনা করে। যারা খেলাপির মধ্যে পড়েছে, তাদের অধিকাংশই গত ১৫ বছর রাজনৈতিক যোগসাজশ কাজে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে।’ চামড়া শিল্পও সংকটে। বিতরণকৃত ঋণের ৩৮.৭৭ শতাংশ এখন খেলাপি, অর্থমূল্যে ৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, পরিবেশ সহনশীল উৎপাদন ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি শিল্পের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ।
জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পেও খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৯.১৭ শতাংশ ব্যাংকে ফেরেনি। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পখাতেও খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৪.৫৮ শতাংশ। ওষুধ খাতের খেলাপি ঋণ কম, মাত্র ১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৫.৭৫ শতাংশ। অন্যান্য বৃহৎ উৎপাদনশীল শিল্পে খেলাপি ঋণ ৩৭ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, ১৪.৫৬ শতাংশ। কৃষিভিত্তিক উৎপাদনশীল শিল্পে খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, ১৪.৩১ শতাংশ।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের বাস্তব হার কম হওয়ার কথা। ঋণ বেড়েছে মূলত ব্যাংক থেকে অসদুপায়ে টাকা বের করার কারণে। টেক্সটাইল খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা খতিয়ে দেখা দরকার।’
উৎপাদনশীল শিল্পের বাইরে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ট্রেড অ্যান্ড কমার্স খাতে, মোট খেলাপি ঋণের ২৫.৫১ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে সেবা খাত, ১২.৫২ শতাংশ। ভোক্তা ঋণ খেলাপি ২.৪১ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার ও অন্যান্য খাতের খেলাপি ঋণ ৮.০১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ২০২৪ সালের শেষে উৎপাদনশীল শিল্পখাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নগদ প্রবাহ সংকটে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে পারেনি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য প্রযুক্তি উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ঋণ প্রদানে কঠোর শৃঙ্খলা জরুরি।

