চলতি অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় ৬ হাজার ৩৪০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এই লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে না।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নতুন কার্যাদেশ বা অর্ডারের ঘাটতি, গ্যাস সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা রপ্তানি খাতের সামনে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে যেখানে দেশের রপ্তানি আয় ০.৫৮ শতাংশ কমেছে, সেখানে আগামী অর্থবছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে অনেক অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন।
তাঁদের মতে, শুধু বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ার অপেক্ষায় থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি সংকট দূর করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা না গেলে রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা কঠিন হবে।
সরকারের নতুন রপ্তানি লক্ষ্য
গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন।
সরকার মোট ৬ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫২০ কোটি ডলার এবং সেবা খাত থেকে ৮২০ কোটি ডলার আয় করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত রপ্তানি আয়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।
পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে তৈরি পোশাক খাত। এই খাত থেকে সরকার ৪ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য নিয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার।
তবে আগের অর্থবছরের অভিজ্ঞতা সরকারের সামনে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার মোট ৬ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এর মধ্যে পণ্য খাত থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার এবং সেবা খাত থেকে ৮৫০ কোটি ডলার আয়ের পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি বার্ষিক হিসাবে ০.৫৮ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে নেমে আসে। অন্যদিকে সেবা খাত থেকে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৭০০ কোটি ডলারে।
ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের পরিকল্পনার কাছাকাছি হলেও বাস্তব অর্জনের তুলনায় তা অনেক বেশি।
কেন কঠিন হচ্ছে রপ্তানি বাড়ানো
রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া।
অনেক কারখানা দীর্ঘদিন ধরে কম উৎপাদন নিয়ে চলছে। পর্যাপ্ত কার্যাদেশ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের স্থাপিত সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট। শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না।
ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বিনিয়োগ কমছে, পুরোনো কারখানাগুলোও সম্প্রসারণ করতে পারছে না।
বিশ্ববাজারের পরিস্থিতিও অনুকূলে নেই। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে ভোক্তাদের কেনাকাটা কমেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকার দেখছে নতুন সুযোগ
রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরছে।
তাঁর মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা কমেছে এবং বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। আগামী তিন বছরের পরিবর্তনকালীন সময়ে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সুবিধা কী হবে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা চলমান রয়েছে। এসব উদ্যোগ রপ্তানি বাড়াতে সহায়তা করবে বলে সরকার আশা করছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যেই এ ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শিগগির শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাপানের সঙ্গে করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে। এরপর এটি কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে।
এই নির্ভরতা কমাতে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ পুনর্ব্যবহার, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার তৈরি পোশাক খাত থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করতে চায়। পাশাপাশি অন্যান্য খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে মোট রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ সহজ নয়। নতুন খাতে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকট বড় বাধা
রপ্তানি খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল রয়েছে। এসব টার্মিনালের মাধ্যমে এর চেয়ে বেশি গ্যাস আমদানি করা সম্ভব নয়।
ফলে রাতারাতি জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সরকার আরও দুটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এটি রপ্তানি খাতের জন্য বড় সমস্যা। কারণ উৎপাদন কম হলে কার্যাদেশ থাকলেও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ১৫ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার আগের বছরের প্রকৃত রপ্তানি আয়ের তুলনায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে পণ্য রপ্তানিতে সংকোচন দেখা গেছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক, স্বল্পোন্নত দেশের উত্তরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসা পরিচালনার সমস্যাগুলো রপ্তানির বড় বাধা।
তবে তিনি মনে করেন, সরকার যদি বন্দর কার্যক্রম দ্রুততর করা, ব্যবসা সহজ করা এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
তবে সেটি ১৫ শতাংশে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে তিনি সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের চোখে বাস্তব চিত্র
তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, সরকার ইতিবাচক কিছু নীতি ঘোষণা করলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে।
তাঁর মতে, চ্যালেঞ্জ দিন দিন বাড়ছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কঠিন।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়বে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেশে গ্যাস সংকট নতুন করে তীব্র হয়েছে। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না।
প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হকও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ার কোনো স্পষ্ট সংকেত এখনো নেই। পাশাপাশি দেশে ব্যাংকের উচ্চ সুদহার, অর্থায়নের সংকট, গ্যাস সমস্যা এবং উৎপাদনশীলতার ঘাটতি রপ্তানি খাতকে চাপে ফেলছে।
সামনে কী করতে হবে
রপ্তানিতে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না, উৎপাদনের বাস্তব বাধাগুলো দূর করতে হবে।
শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থার গতি বাড়ানো এবং নতুন বাজার তৈরি করা জরুরি।
একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
সরকারের লক্ষ্য বড়। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ রপ্তানি আয় বাড়ানো শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয় নয়, এটি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
৬৩.৪ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও ব্যবসায়ীরা কতটা দ্রুত বাস্তব সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে পারে।
:::

