গণ-অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আপনার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তারা আপনার পরামর্শ মেনে কাজ করছে। এই যে তরুণ নেতৃত্ব সরকারে ও রাজনীতিতে একটা সংকটকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এর দায়ভার আপনার কাঁধে চাপান অনেকে। আপনি কী মনে করেন?
যারা দায়ভার চাপাচ্ছেন তারা কি গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী? তারা কি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন চাননি? আর তরুণদের দায় কেন আমার ওপর পড়বে? তারা আমার কথামতো চলছে না। কিংবা চলতে হবে তারও কোনো যুক্তি নেই। তারা যতটুকু আমাকে গ্রহণ করেছে, ততটুকু সফল হয়েছে। রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন অনেক জটিল এবং আইন ও রাজনৈতিক দিক থেকে গভীর প্রশ্ন। তরুণদের চিন্তার দুর্বলতা থাকবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা সাধারণভাবে আমাদের সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অভাব বলতে পারেন, কিন্তু সেটাও কেটে যাবে বলে আমি মনে করি। আমি যখন ২০২৩ সালে ‘গণ-অভ্যুত্থান ও গঠন’ নামে বই লিখি তারপর তরুণদের বিশাল একটা অংশ অনুপ্রাণিত হয়। তারা বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে জীবন তুচ্ছ করে গণ-অভ্যুত্থানটা করেছে। তাহলে প্রশ্নটা হবে এমন— গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের একাংশকে নিয়ে এই যে একটা সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীনে কায়েম করা হলো, এটা করল কারা? তাদের চিহ্নিত করা দরকার।
এছাড়া রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামে বিজয় পতন আছেই। আমি যেভাবে বলেছি সেটা হয়নি। আমি বলেছি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে হবে। সে সরকারের কাজ হবে পুরনো সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা উৎখাত করে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা। এটা করা যায়নি, এটা তো আমার দোষ নয়। তাহলে এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে ৫-৮ আগস্ট কারা শেখ হাসিনার সংবিধান মেনে সরকার গঠনের কথা বলেছিল, কারা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র বহাল রাখার শপথ নিতে ছাত্রদের বাধ্য করল। এটা এখনো শেখ হাসিনার রাষ্ট্র হাসিনা নেই, কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামো সম্পূর্ণ বহাল ও সক্রিয় আছে।
অর্থাৎ আমাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কিংবা চিন্তার শক্তির কোনো বিকাশ ঘটেনি। ১৯৯১-এ আমরা বলেছিলাম না? ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’— এবারো তাই ঘটল। ‘এক দফা এক দাবি হাসিনা তুই কবে যাবি’। ’৯১-এ কিন্তু একই কাজ হয়েছে, আমাদের গলার কাঁটা বাহাত্তরের সংবিধানটাকে বলবৎ রেখে পুরনো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পরিবর্তন না করে একটা তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা হলো। আমরা নির্বাচন করলাম একবার কি দুবার! তারপর আবারো আমরা পুরনো বৃত্তে ফিরে গেলাম। এবারো তাই হয়েছে! এবার যে আমাদের নয়া সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাকে নষ্ট করেছে অল্প কিছু ব্যক্তি। এদের গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে হবে। তারাই শেখ হাসিনার পুরনো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করেছে। আমাকে কিংবা তরুণদের দোষারোপ করবেন না।
আমরা দেখছি গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার ও শাসন তথা ক্ষমতাকাঠামো বিন্যাসে দেনদরবার চলতেছে। রাষ্ট্র সংস্কারে মনোযোগ কম এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?
আমি সেটা দেখি না। এখন কথা হলো ক্ষমতাকাঠামো বলতে আপনি কী বোঝেন? ক্ষমতার প্রথম কথা হলো গঠনতন্ত্র বা সংবিধান, সংবিধান হলো ক্ষমতার ভিত্তি। ক্ষমতা কখন এসেছিল, ৫ (আগস্ট) জনগণের কাছে ক্ষমতা এসেছিল। এই যে ৫ তারিখে ক্ষমতা এসেছে, এটাকে বলে গাঠনিক মুহূর্ত। অর্থাৎ নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষমতা। কিন্তু আমরা শুধু সরকার নিয়ে কথা বলি রাষ্ট্র নিয়ে বলি না। সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক নেই রাষ্ট্রই ক্ষমতার চরিত্র ও চর্চার ধরন নির্ণয় করে। সরকার বিদ্যমান সংবিধান বা ক্ষমতার অধীনে শপথ নিয়েছে। এ (অন্তর্বর্তীকালীন) সরকার কি শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীনে শপথ নেয়নি? তাহলে তাদের ক্ষমতা শেখ হাসিনার সংবিধান দ্বারাই নির্দিষ্ট। শেখ হাসিনার সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে একটি অবৈধ জগাখিচুড়ি বানিয়ে সরকারকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই।
সরকার যদি কোনো ভুলও করে সে দোষ কি শুধু সরকারের? আপনারাই এ সরকার বানিয়েছেন। আপনারাই এ সরকারকে সত্যিকার অর্থে পূর্ণ ক্ষমতার সরকার বনে যেতে দেননি। সরকারের নিন্দা কেন করা হচ্ছে? এ কাজ যারা করেছে, তাদের খুঁজে বের করা দরকার। যারা শেখ হাসিনার সংবিধানে হাত রেখে শপথ নিয়েছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে কেন গণ-অভ্যুত্থানের পরে সেনাসমর্থিত অবৈধ সরকার গঠন করা হলো? ৫ আগস্টে জনগণের হাতে ক্ষমতা ছিল, সে ক্ষমতা আবার ফ্যাসিস্টদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ আমরা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থাই কায়েম রাখলাম। ফ্যাসিস্টদের হাতে আবার ক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আমরা বর্তমানে নির্বাচন চাইছি। এটা কি জনগণ মেনে নেবে? আমরা কি মেনে নেব? আমরা ড. ইউনূসের বিপক্ষে না। তাকেও বুঝতে হবে তিনি জনগণের জন্য ক্ষমতায় আছেন, জনগণ গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে ড. ইউনূসকে এনেছে। কিন্তু তাকে কোনো কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। তার দায় আছে অবশ্যই কিন্তু সব দায় ড. ইউনূসের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে চলবে না।
এ সরকারকে বলা হয় আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল সরকার—এটা আপনি কীভাবে দেখেন?
আমরা তো আমলাতন্ত্র উৎখাত করতে দিইনি। সংবিধান রয়েছে শেখ হাসিনার সংবিধান, আমলাতন্ত্রই তো থাকবে। শেখ হাসিনার সামরিক-বেসামরিক আমলারাই থাকবে। বারবার সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছেন, আপনি রাষ্ট্র বানাননি। আপনি বললেন, আমলাতন্ত্র এখনো রয়ে গেছে। আমার কথা হলো আমলাতন্ত্র থাকবে না কেন, আপনি সে পুরনো রাষ্ট্রই রেখে দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীনে উপদেষ্টাদের শপথ করিয়েছেন। এ কারণে আমলাতন্ত্রের সঙ্গে লড়াই করে জেতা উপদেষ্টাদের পক্ষে সম্ভব না, পারছেনও না তারা। আপনি ড. ইউনূসকে নতুন রাষ্ট্র বানাতে দেননি। তাহলে তার বিরুদ্ধে কথাইবা বলছেন কেন?
রাষ্ট্র ও সরকার এ দুইয়ের পার্থক্য মনে রাখতে হবে। রাষ্ট্র গঠন করতে পারেননি বলেই আমলাতন্ত্র, রাষ্ট্র গঠন করতে পারেননি বলেই এখনকার যে সেনাবাহিনী সেটিই রয়েছে বিচারক, আদালত সবই আগের মতোই আছে, আগের সব রাজনৈতিক দল ঠিক যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। আমি একটা কথা বলি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা মানে হলো নতুন নির্বাচনী বিধিমালা তৈরি করা। মানে এখন যে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, সেটি তৈরি হতো নতুন গঠনতন্ত্রের আলোকে। তাহলে এখন যেসব পুরনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত তারা শেখ হাসিনার অধ্যাদেশের দ্বারা নিবন্ধিত। এখন বিএনপিও পুরনো শেখ হাসিনার গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের অধীনে নিবন্ধিত। কিন্তু যদি নতুন রাষ্ট্র গঠিত হতো তখন অনেক দলই হয়তো নিবন্ধন পেত না। নিবন্ধিত দল আকারে স্বীকৃত না-ও পেতে পারে।
নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করলে নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনও তৈরি হবে। নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন তৈরি হলে সে আদেশের অধীনে বিএনপিসহ সব দলকেই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে। কারণ এটা নতুন রাষ্ট্র, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট কাঠামো হবে না, বলাই বাহুল্য। ফলে বিএনপি আদৌ রাজনৈতিক দল কিনা এটা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ বিএনপি জাতীয় নির্বাচন চায়, কিন্তু নিজে নির্বাচন করে না। বিএনপির মধ্যে কোনো নির্বাচন হয়েছে?
তারা গণতান্ত্রিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়? তাহলে এটা কোনো রাজনৈতিক দলই না। রাজনৈতিক দল হলে আপনার দলের মধ্যে নির্বাচন থাকবে, তর্কবিতর্ক থাকবে। সেখান থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠদের যে মত সে মতের ভিত্তিতে আপনি সামনে এগোবেন। বিএনপি যদি সত্যিকার অর্থে জিয়ার অনুসারী, জিয়ার রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে তার এটা অনস্বীকার্য কর্তব্য বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়ার আগে বিএনপিকে অবশ্যই প্রথমে (নিজেদের দলের মধ্যে) নির্বাচন করতে হবে।
আমাদের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে গণমুখী করার জন্য কী করা যায়?
আগে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। আপনি যদি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র তৈরি করেন তাহলেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনি অন্যান্য ক্ষেত্রে যেতে পারবেন। সে নিয়মগুলো নিয়ে তর্কবিতর্ক হতে পারে। আপনি যখনই নতুন গঠনতন্ত্র তৈরি করবেন সেখানে থাকবে আপনি কী ধরনের প্রশাসন চান, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কী রকম হবে, বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক কী হবে এগুলো নিয়েই তর্ক। এ তর্ক আপনি গঠনতন্ত্র প্রণয়নের সময় করবেন। সে গঠনতন্ত্র নিয়ে গণপরিষদে তর্কবিতর্ক হবে। তাই গণপরিষদে তর্কের বিষয়কে বাইরে এনে কোনো লাভ নেই। ফলে আগে গঠনতন্ত্রটা প্রণয়ন করেন। গঠনতন্ত্রের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনটা করেন। তারপর আপনি সরকারের কথা বলেন।
আমরা দেখলাম যে অভ্যুত্থানে তরুণদের একটা বিশাল অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব ছিল। তাদের উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে যে মনোযোগ দেয়া দরকার, সেখানে কী ধরনে পলিসি নেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আপনি অনেক বড় একটা প্রশ্ন করলেন। আমি যে শিক্ষা দেখছি, সে শিক্ষাটা তাদের পেতে হবে। যে গণতন্ত্র কাকে বলে? তারা (জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রপ্রতিনিধিরা) পরিষ্কার। কারণ তারা গঠনতন্ত্রের কথা বলছে, গণপরিষদ নির্বাচনের কথা বলছে। তরুণদের একের পর এক আপস করতে বাধ্য করা হয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে চেয়েছিল তারা সরকার তাদের তা দিতে দেননি। আমরা তরুণদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছি। আপনি তিনজন তরুণকে ক্ষমতায় নিয়েছেন, বাকিদের বাইরে রেখে দিয়েছেন। আপনি তরুণদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন, কারণ আপনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের নেতা করেছেন, কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপেক্ষা করেছেন, এটা হয় না।
তাহলে প্রথম কাজটা হচ্ছে তরুণদের যে প্রাপ্য আপনি তাদের সেটা বুঝিয়ে দেবেন। গণ-অভ্যুত্থান করেছে তারা, তাদের মতো করে একটা জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে চেয়েছে, আপনি গিয়ে ওখানে আবার নিজেরা ঘোষণাপত্র দেয়ার ঘোষণা দিলেন। ড. ইউনূসকে এ অধিকার কে দিল তিনি একটা ঘোষণাপত্র লিখবেন? যেখানে তিনি একজন সেনাসমর্থিত সরকারের উপদেষ্টামাত্র। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের কেউ নন। তার কি বৈধতা আছে ঘোষণাপত্র দেয়ার? তিনি কেন তরুণদের ঘোষণাপত্র দিতে নিষেধ করেছেন? কী যুক্তিতে ফলে এগুলো একটার পর একটা ভুল হয়েছে। এ ভুল কেন করি? কারণ আমাদের সমাজে রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার যে ধারণা সেটা খুবই দুর্বল। আমরা বুঝি না সরকার কাকে বলে, রাষ্ট্র কাকে বলে, কার কী বৈধতা আছে, কে কী বলতে পারে, কী পারে না। সবার অবদানকে আমরা কীভাবে একটা রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসব সেটাই হলো এখনকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সেখানে আমাদের নিষ্ঠ থাকতে হবে।
আপনি যে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর কথা বলেন, সেখানে আওয়ামী লীগ আছে, জাতীয় পার্টি আছে। এখানে আওয়ামী লীগের প্রশ্নটা কীভাবে সমাধান হবে?
আপনি আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে না বলেন, যারা ফ্যাসিবাদী না, যারা ফ্যাসিস্ট শক্তিকে সমর্থন করে না সবাই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আমি তো কারো নাম নিইনি। শেখ হাসিনা যদি আজকে ব্যক্তি অধিকার, ব্যক্তির মর্যাদা, জীবন-জীবিকা রক্ষায় রাষ্ট্রের নীতি ইত্যাদি মানতেন । প্রাণপ্রকৃতি পরিবেশ যদি ধ্বংস না করে রক্ষা করতেন এজন্য যদি কোনো নীতি গ্রহণ করতেন তাহলে কি তাকে সরানো সহজ হতো না। তিনি যদি ইলেকশনও (নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন) মেনে নিতেন, তাহলে আবার ইলেকশনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় ফিরেও আসতে পারতেন। এটা তিনি করেননি করতে পারেননি কারণ শেখ হাসিনা দিল্লির ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। তার যে ভূরাজনৈতিক কৌশল, যে রণনীতি তা দিল্লির আধিপত্য বহাল রাখার কৌশলের অধিক ছিল না। একটি পরাশক্তি হিসেবে এ উপমহাদেশে দিল্লি যে নীতি চালু রেখেছে। আওয়ামী লীগ সেটা বাস্তবায়নের একটি উপায় হয়ে গিয়েছিল।
অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন যে ভূরাজনৈতিক কৌশল, পররাষ্ট্রনীতি এর রূপরেখাটা আসলে কেমন হবে?
উপমহাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাংলাদেশকে নিপীড়িত মজলুম শ্রেণীর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের কেন্দ্র ও নেতা হতে হবে। এ নেতৃত্ব, যেটা জিয়াউর রহমান সার্কের মধ্য দিয়ে কিছুটা শুরু করে দিয়েছিলেন তাকে কীভাবে কার্যকর রাখা যায় ভাবতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যদি সার্ক পুনর্গঠন ও সক্রিয় করতে পারি, তাহলে এ নেতৃত্ব আমাদের হাতে আসবে। কিন্তু বাংলাদেশকে অবশ্যই উপমহাদেশের বাস্তবতাকে মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিকভাবে দাঁড়ানোর মানে হলো অর্থনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা, শক্তিশালী বাংলাদেশ, ঢাকা তার রাজধানী।
সে ঢাকাকে কেন্দ্র করে পুরো উপমহাদেশ পুনর্গঠিত হবে, এটাই হবে আমাদের ভূরাজনৈতিক নীতি। অর্থাৎ আমাদের প্রধান লক্ষ্য হতে হবে দ্রুত ও ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক বিকাশ, দ্রুত বিজ্ঞান ও টেকনোলজি আত্মস্থ করা এবং নিজেদের জন্য বিশ্ব অর্থনীতিতে একটা শক্তিশালী অবস্থান আদায় করে নেয়া। সে পুনর্গঠন যদি আমরা করতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই ভারতের জনগণের সঙ্গে সৌহার্দ্য-প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আমাদের লড়াইটা হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই আছে অবশ্যই, কিন্তু খেয়ে না খেয়ে ভারতবিরোধী হলে হবে না। হিন্দুত্ববাদ আর ভারতের গণতান্ত্রিক জনগণ এক নয়। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্য মোকাবেলার সঠিক পথ।
শুধু পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকান, সেখানকার ২৫-৩০ শতাংশ অধিবাসী মুসলমান। তারা হিন্দুত্ববাদের শিকার। বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদবিরোধী লড়াই যদি আপনি করেন, তাহলে তার দ্বারা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা উপকৃত হয়। আর যদি আপনি ভারতবিরোধী হন, তাহলে এটা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যায়। কারণ তারা ভারতীয়। তাহলে আমি ভারতবিরোধী হব কেন? ভারতে কি মুসলমান নেই,দলিত নেই, নিম্ন বর্ণের মানুষ নেই? তাহলে আমাকে যেটা করতে হবে যেন তাদের অধিকার ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়, সে লড়াই আমি করছি।
সেক্ষেত্রে তথাকথিত ভারতবিরোধিতা ভারতের আধিপত্যবাদকেই তুষ্ট করে। আমরা দিল্লিবিরোধী, ভারতবিরোধী না। আমরা দিল্লির যে আধিপত্যবাদী রাজনীতি তার যে আগ্রাসন, তার বিরোধী। এটার বিরোধী জিয়াউর রহমানও ছিলেন। আমি বারবার জিয়াউর রহমানের কথা বলছি এটা কেন, কারণ আজকের পরিপ্রেক্ষিতে আমি জিয়াউর রহমানের কথা খুব অনুভব করি। তিনি যদি জীবিত থাকতেন তাহলে আমি যে কথাগুলো বলছি, সহজেই সেগুলো তিনি বুঝতেন। কারণ প্রথমেই বলি, তিনি একজন সৈনিক, তিনি পরিচ্ছন্ন, তিনি বুঝতেন ভূরাজনৈতিক দিক একই সঙ্গে সামরিক বিষয়ও বটে। এ দিকগুলোর কতটা গুরুত্ব ছিল, কতটা তাৎপর্যপূর্ণ সম্ভবত তাকে সহজে বোঝানো যেত।
১৯৫২ সালে আমরা ভাষার জন্য লড়লাম, ভাষা পেলাম, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে একটি স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপট তৈরি হলো, ’৯০-এর পর গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ায় এলাম, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে আমাদের প্রাপ্তিটা কী?
১৯৭১ সালে আমাদের প্রাপ্তিটা কী সেটা আগে বলেন। একটি স্বাধীন দেশ? ব্যস আর কিছু পাননি। তাহলে এরপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশ পেয়েছি রাষ্ট্র পাইনি। তাহলে লড়াইটা ছিল ১৯৭১ সালের পর থেকে একটি রাষ্ট্র গঠন করার। কথাটাই আপনাদের মাথায় ঢুকতেছে না, বারবার রাষ্ট্র রাষ্ট্র বলতেছি। সবাই সরকার সরকার বলে চিৎকার করছে। আপনাদের কারো মাথায় ঢুকছে না কেন?
আপনারা রাষ্ট্র বোঝেন না কেন? রাষ্ট্র আসলে সরকার না। এবারো রাষ্ট্র পেলাম না, ১৯৭২ সালেও পাইনি। ’৭২-এর সংবিধান কারা লিখেছে? ছাত্ররা যে বলল, ’৭২-এর সংবিধান বাতিল কর। বিএনপি সেটা শুনল না কেন? সেই ’৭২-এর সংবিধানের প্রতি বিএনপির এত দরদ কেন? তারা যদি বলত হ্যাঁ জিয়াউর রহমানের আদর্শের ১৯ দফার ওপর আমরা একটি নতুন গঠনতন্ত্র দেব বাংলাদেশের জন্য এটা আরো বেশি দরকার হতে পারে। আমরা বলতাম বাহ খুব ভালো। এবার আসো কী রকম গঠনতন্ত্র ১৯ দফার আলোকে হতে পারে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করি। বিএনপি কি আমাদের তা বলেছে, বলেনি। যদি না বলে থাকে তাহলে বিএনপি এখন গণশত্রু কেন? তারা জিয়াউর রহমান ও তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণীর দল হয়ে উঠতে চায়। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে তারা আওয়ামী লীগ হতে চায়। একমাত্র গণশত্রুরাই রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন বাদ দিয়ে নির্বাচন চায়। এ বিএনপিকে জনগণ কি মেনে নেবে, মানবে না। সূত্র: বনিক বার্তা

