রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় ঋণের বোঝায় নিম্ন আয়ের মানুষ একের পর এক দিশেহারা হচ্ছে। সুদের কারবারি ও এনজিওগুলোর সহজলভ্য ঋণের ফাঁদে পড়ে তারা আজ জীবনের কঠিন সংকটে। অনেকেই ঋণের বোঝা সামলাতে ভিটেমাটি ছেড়ে দেশের ভেতরে বা দেশের বাইরে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। তবুও ভাগ্যের চাকা তাদের কাছে দয়ালু হচ্ছে না।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা আত্মহত্যা করেছেন। শুধু আত্মহত্যাই নয়, কিছু ক্ষেত্রে স্বামী নিজ হাতে স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করার দুঃখজনক খবরও এসেছে। এছাড়া অনেক পরিবার ঋণের বোঝা সামলাতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। রাজশাহীর এই পরিস্থিতি দেশীয় অর্থনীতির নিম্নবিত্তদের কঠিন বাস্তবতা এবং ঋণ ব্যবস্থার অপ্রতিরোধ্য ঝুঁকি তুলে ধরে।
পরপর এমন বেশ কিছু ঘটনায় এনজিও, সুদের কারবারিদের দৌরাত্ম্য সামনে এসেছে। যদিও ঋণের চাপে আত্মহত্যার ঘটনার সরকারি কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে খবরের কাগজের অনুসন্ধানে এসব ঘটনার কারণ হিসেবে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, জমির দলিল বা কাগজপত্রের জটিল শর্ত এড়াতে নিম্ন আয়ের মানুষ ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে এনজিওর কাছে যাচ্ছে। এনজিওগুলো সহজ শর্তে ঋণপ্রার্থীদের হাতে দ্রুত নগদ টাকা তুলে দিচ্ছে। কেউ আবার ঋণ নিচ্ছেন সুদের কারবারি বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।
এতে ঋণের ওপর সুদের হার কার্যত ৩০ শতাংশ বা তার বেশি হচ্ছে। ফলে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঋণ নিয়ে চাপে পড়ে যান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পেতে দ্বারস্থ হন আরেকটি সংস্থার। এভাবে জড়িয়ে পড়ছেন ঋণের ভয়ংকর ফাঁদে। তারা ভিটেমাটি বিক্রি করেও ঋণের জাল ছিন্ন করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। কেউ কেউ পালিয়ে যাচ্ছেন সমাজ-সংসার ছেড়ে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজশাহীসহ জেলার প্রায় প্রত্যেক উপজেলায় একই চিত্র। এটি শুধু রাজশাহীতেই নয়, দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে।
সহজ শর্তে টাকা নেওয়ার সুযোগ থাকায় রাজশাহীর প্রায় প্রত্যেক উপজেলায় ছড়িয়ে গেছে এনজিওর ঋণের জাল। শতভাগ না হলেও অনেক গ্রামের ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঋণ নিলেও পরবর্তী সময়ে তা হয়ে পড়ছে গলার ফাঁস। এই ফাঁস থেকে মুক্তি পেতে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবারসহ দেশান্তরী হচ্ছেন অনেকে। কিস্তি দিতে না পারলে মামলা হয় ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে। পরে টাকা পরিশোধ করলেও সেই মামলা চালিয়ে যেতে হয়। সেখানেও অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে এক চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য চলার কারণেই এ ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আত্মহত্যার অনেক কারণ থাকলেও বর্তমানে ঋণের চাপ অন্যতম। অথচ এটি নিয়ে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাসহ কারোরই মাথাব্যথা নেই। এনজিওর ঋণের কিছু ভালো দিক থাকলেও এর অন্ধকার দিকই বেশি। কেননা এ কারণে অনেক মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে ফেলছেন। দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে গত এক বছরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবারের সদস্যদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে বেশ কষ্ট করছেন। আবার একশ্রেণি তাদের আখের গোছাচ্ছে। সাধারণ মানুষ অভাবের তাড়নায় ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত ও পারসেন্টেস দেওয়ার ভয়ে ব্যাংকের পরিবর্তে উচ্চ সুদেও এনজিওর দ্বারস্থ হচ্ছেন তারা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এন কে নোমান বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার যে প্রবণতা তা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ ঋণ নিয়ে যথাযথ কাজ না করে তা ভোগ করেন। ফলে এখান থেকে রিটার্ন আসে না। আবার এই সুদভিত্তিক ঋণের ফলে একসময়ে তা অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। যখন সময়মতো কিস্তি দিতে না পারেন, তখন সেই ভোক্তা সামাজিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত হন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আরেক জায়গা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে এই ঋণ এবং সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে তাকে ঘিরে ধরে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলে অনেকে ব্যক্তিপর্যায়ে ঋণ বা মহাজনি কারবার চালান। এ থেকে বেরিয়ে আসতে গোটা ব্যবস্থার সংস্কার দরকার। কিন্তু বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় আছে, সেখান থেকে ভোক্তাপর্যায়ে এ ব্যবস্থাগুলো সংস্কার করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে আত্মহত্যা বা এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিপর্যায়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে হবে। ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এনজিও ও সুদ কারবারিদের যে নির্মম মারণফাঁদ, তা থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে রক্ষা করতে এখনই সরকারকে তৎপর হতে হবে।
সুদের কারবারিও এনজিওগুলোর সহজলভ্য উচ্চ সুদ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সে সম্পর্কে ঋণগ্রহীতাদের সচেতনতা এবং এর সুফল-কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি, দেশের প্রচলিত ঋণব্যবস্থার সংস্কার করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করছি, সরকার বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার করে এ দেশের অগণিত নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সূত্র: খবরের কাগজ

