একসময় বাংলাদেশী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বাংলাদেশী সিইও পাওয়া দুষ্কর ছিল। কিন্তু এখন সেই চিত্র পাল্টেছে। বাংলাদেশী সিইও নেই এমন মাল্টিন্যাশনাল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। আগামী দিনে আমরা গ্লোবাল মঞ্চে আরো এগিয়ে যাব। নতুন প্রজন্মের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা। তারা বিশ্বমানের কোম্পানির নেতৃত্বে দাঁড়াবে। অনেকের ধারণা যে বাংলাদেশের তরুণেরা গ্লোবাল ব্যাবসায় সাফল্য পাবে, তা এখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
এটি শুধু দেশীয় উদ্যোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক খাতেও বাংলাদেশের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ। বর্তমান প্রজন্মের দক্ষতা ও মনোবল গ্লোবাল কোম্পানিগুলোর সিইও হিসেবে নিজেদের প্রমাণের পথে এগোচ্ছে। ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বৈশ্বিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে ১৯৬২ সালে। আজ দেশের প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ৯টিতেই রয়েছে ইউনিলিভারের কোনো না কোনো পণ্য। দেশের অন্যতম টেকসই প্রতিষ্ঠান ও এমপ্লয়ার অব চয়েস হিসেবে বহুবার পেয়েছে স্বীকৃতি। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে স্নাতক জাভেদ আখতার। ২০২৩ সালে চেয়ারম্যান হন। ইউনিলিভার বাংলাদেশে দীর্ঘ ২৫ বছরের সাফল্যমণ্ডিত কর্মজীবন শেষে তিনি দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ইউনিলিভার ইন্দোনেশিয়ার।
শুরুতেই আপনাকে অভিনন্দন। ইউনিলিভারের পক্ষ থেকে আপনি দেশের বাইরে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় ব্যবসায় নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন। আপনার কাছে শুনতে চাই, বাংলাদেশে ইউনিলিভারের যাত্রা ও একই সঙ্গে আপনার কর্মজীবন ইউনিলিভারে কীভাবে শুরু হলো?
অনেক ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। ইউনিলিভার প্রায় ১৯৬২ সাল থেকে বাংলাদেশে আছে। তখন আমরা পণ্য নিয়ে আসতাম। ১৯৬৪ সালে কারখানা স্থাপন করেছি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। একসময় আমরা শুধু সাবান বিক্রি করতাম। এখন ডিটারজেন্ট, কসমেটিকসের ব্যবসা আছে, বিউটি অ্যান্ড ওয়েল বিয়িং আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরাও উত্তরোত্তর উন্নতি করেছি। আমি ইউনিলিভারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি ২০০০ সালে। ২৫ বছরের পথচলা। এর মধ্যে অর্ধেক সময় দেশের বাইরে এবং অর্ধেক দেশে ছিলাম।
ইউনিলিভারের কারখানা তো একটা ঐতিহাসিক জায়গায়। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে কালুরঘাটের নাম জড়িত। স্বাধীনতার পর ইউনিলিভার নতুন করে বাংলাদেশে জন্ম নেয় লিভার ব্রাদার্স বাংলাদেশ নামে। ইউনিলিভারের পণ্য হুইল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সবাই চেনে। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে ১০টি ঘরের মধ্যে নয়টিতে ইউনিলিভারের পণ্য পৌঁছে গেছে। এ সাফল্য কীভাবে তৈরি হলো?
পুরো যাত্রার ব্যাপারে কয়েকটা জিনিস কাজ করেছে। প্রথমত হচ্ছে পণ্য। হুইল, লাইফবয়, লাক্স সাবান—প্রতিটি পণ্যই কিন্তু বাংলাদেশে বাজারজাতের জন্য তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত হলো পণ্যের দাম নির্ধারণ। পণ্যের দাম নির্ধারণে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা ভাবা হয়েছে। আমাদের সব পণ্যই ছোট ছোট প্যাকেও আছে, বড় বড় প্যাকেও আছে। আমরা প্রায় ছয় লাখ দোকানে যাই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইউনিলিভারের পণ্য দেখা যায়। ব্র্যান্ড, প্রাইস পয়েন্ট ও ডিস্ট্রিবিউশন—এ তিনটি কারণেই এতদূর এসেছে ইউনিলিভার।
ইউনিলিভারের সাফল্যের সঙ্গে কি বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের কোনো সংযোগ রয়েছে? আপনাদের প্রবৃদ্ধির পেছনে এটার কতটা ভূমিকা রয়েছে?
আমরা যে পণ্য বিক্রি করি তার ৯৫ শতাংশই কিন্তু নারীদের জন্য। আশির দশকের দিকে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প বিস্তার লাভ করেছে। তখন থেকে আমরা দেখেছি, যতই নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে, নারীরা কর্মমুখী হয়েছে ইউনিলিভারের পণ্য বিক্রি বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে এটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইউনিলিভার ব্র্যান্ডও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করেছে। আমরা গিয়ে অনেক জিনিস শিখিয়েছি। যেমন ওরাল হাইজিন, টুথব্রাশ ব্যবহার, হাত ধোয়া। মায়েদের যখন শেখানো হয় তখন পরবর্তী প্রজন্মও কিন্তু হাইজিনের ব্যাপারে অনেক সচেতন হয়।
আপনারা যখন বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেন তখন তো দেশে এফএমসিজির অন্য কোনো কোম্পানি ছিল না। পরে অনেক স্থানীয় কোম্পানি এসেছে, অনেক পণ্য এসেছে। বিভিন্ন দেশে ইউনিলিভার নানা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশে এ প্রতিযোগিতা আপনারা কীভাবে অনুভব করেন?
বাংলাদেশে অনেক স্থানীয় কোম্পানি এসেছে। যথেষ্ট প্রতিযোগিতা আছে। ইউনিলিভার একচেটিয়া ব্যবসা করছে বিষয়টি এমন নয়। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো পণ্য তৈরি করছে, তারাও শিখছে। এ কারণে আমাদেরও নিজেদের পণ্য আরো ভালো করতে হচ্ছে। পণ্যমূল্য যাতে প্রতিযোগিতামূলক (কম্পিটিটিভ) হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে। ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমকেও আমরা আধুনিকীকরণ করার চেষ্টা করছি। যাতে আমরা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারি। যত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে সেটা দেশের জন্য তত ভালো। কারণ আমাদের পার ক্যাপিটা এফএমসিজি পণ্য ব্যবহার খুবই কম। ভারতের অর্ধেকের চেয়েও কম, ভিয়েতনামের এক-চতুর্থাংশ। সে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্যবসা বড় করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এটা তো একটা কোম্পানি কখনো করতে পারবে না। নতুন নতুন কোম্পানি যখন আসবে ব্যবসাটা বাড়বে। এফএমসিজি শিল্পের আরো সম্প্রসারণ ঘটবে।
পুরো বিশ্বে বিশেষ করে আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বৈশ্বিক নেতারা কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা, প্লাস্টিক পণ্য পরিহার করার যে বৈশ্বিক আন্দোলনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেখানে ইউনিলিভার বৈশ্বিকভাবে কী করছে, বাংলাদেশে কী কাজ করছে?
আমরা ইউনিলিভারে সাসটেইনেবিলিটির চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দিই। যাতে আমার ব্যবসার সাসটেইনেবিলিটি বজায় থাকে। একটা হচ্ছে জলবায়ু, একটা হচ্ছে প্রকৃতি, একটা হচ্ছে প্লাস্টিক, এরপর হচ্ছে জীবিকা। এ চারটার মধ্যে আমরা বাংলাদেশে তিনটা পিলারে কাজ করছি। একটা হচ্ছে ক্লাইমেট। আমরা চেষ্টা করছি গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ যতটা কমিয়ে ফেলতে পারি। অপারেশনের মাধ্যমে চেষ্টা করছি যাতে পানির ব্যবহার কমিয়ে আনা যায়। বিদ্যুৎ ব্যবহারটি আমরা যেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করতে পারি—সে চেষ্টা করছি। আমরা যাতে আরো দক্ষ অপারেশন চালু করে আমাদের জ্বালানিটা টেকসই (সাসটেইনেবল) করতে পারি—সে চেষ্টাও চলছে।
কার্বন মনোক্সাইডের নিঃসরণ ২০৩০ সলের মধ্যে বলছি আমরা নেট জিরো হয়ে যাব। আমরা এখন অনেক বিনিয়োগ করছি সৌরশক্তিতে (সোলার এনার্জি)। যাতে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে পারি। আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে আমরা সেটা করেছি। আমরা এটা আমাদের কারখানায়ও করছি। তিন বছর ধরে ইউনিলিভার কিন্তু বাংলাদেশে প্লাস্টিক নেগেটিভ একটা কোম্পানি। আমাদের পণ্যের সঙ্গে যে পরিমাণ প্লাস্টিক যায় তার চেয়ে বেশি প্লাস্টিক আমরা সংগ্রহ করছি এবং সেটাকে প্রসেস করেছি। আমরা বহু বছর ধরে এটা নিয়ে কাজ করেছি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করেছি। ইউএনডিপির সঙ্গে কাজ করলাম। ওখান থেকে শিখে সে মডেলটা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করেছি। আমাদের একটা লোকাল পার্টনার আছে তাদের সঙ্গে কাজ করে আমরা সে মডেলটাকে প্রয়োগ করতে পেরেছি। প্লাস্টিক নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে।
চতুর্থ যে জিনিসটা, সেটা হচ্ছে জীবিকা। আমাদের দেশে আমরা ন্যূনতম মজুরি নিয়ে কথা বলি। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে লিভিং ওয়েজটা ন্যূনতম মজুরির দ্বিগুণ। কিন্তু আমরা যেটা বুঝি যে আমাদের পুরো ইকোসিস্টেমে আমরা যেটা চেষ্টা করব সেটা হচ্ছে জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি (লিভিং ওয়েজ) নির্ধারণ করতে। তার মানে হচ্ছে একজনকে বেঁচে থাকতে যে পরিমাণ আয় করা দরকার—সেটা যেন আমরা করতে পারি। বাংলাদেশ ইউনিলিভারে যারা আছে তাদের লিভিং ওয়েজ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তারা যথেষ্ট ওপরে আছে। কিন্তু আমাদের ইকোসিস্টেমে আরো যারা আছে, যেমন আমাদের ডিস্ট্রিবিউটর ও সেলসম্যানরা আছে—তারা যেন লিভিং ওয়েজে যায়। সবাইকে কীভাবে লিভিং ওয়েজে আনা যায় সে চেষ্টা করছি।
আপনার যখন ইউনিলিভারে যাত্রা শুরু, তার কিছুদিন পরই ইউনিলিভার একটা ফ্লোটিং বা ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণ করে সারা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছিল। হাসপাতাল নির্মাণের পেছনে ইউনিলিভারের কী উদ্দেশ্য ছিল? কেন এ ধরনের হাসপাতাল তারা নির্মাণ করল?
আসলে ওই হাসপাতালটা ছিল ফ্রেন্ডশিপ নামে একটি এনজিওর। এটা এখনো চলছে। ওই হাসপাতালের শুরুটা আমিই করেছিলাম। আমার সঙ্গে দুজন সহকর্মী ছিলেন। ইভসমার নামে এক ফ্রেঞ্চ ভদ্রলোক এ ব্রাঞ্চটা নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এসে দেখলেন চরাঞ্চলে মানুষের মেডিকেল সেবা পাওয়াটা খুবই কঠিন। এটা ২০০১-০২ সময়ের কথা। তখন আইডিয়া এল আমরা যদি ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণ করতে পারি চরাঞ্চলে, সেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসতে পারবে। যেহেতু ভাসমান হাসপাতাল এটা যমুনা সেতু থেকে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করতে পারবে। আমি বহুবার গিয়েছি। দেড়-দুই বছর আগেও গিয়েছি। এখনো লোকজন যে পরিমাণ স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছে এটা অসাধারণ একটা কাজ। আমি আমার কোম্পানির সবাইকে বলি এটা একবার না একবার গিয়ে দেখে আসতে। একটা কোম্পানি সমাজের ওপর কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এটা তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।
কভিডের সময় ইউনিলিভারের জার্নিটা কেমন ছিল?
কভিড তো সবার জন্য অজানা জিনিস ছিল। ব্যবসা কীভাবে করব, যেখানে আমাদের ব্যবসাগুলো খুবই ফিজিক্যাল। আমি দায়িত্ব নিই ২০২১ সালে, তখন কভিডের শেষ দিক। কভিডের ক্ষেত্রে যেটা হচ্ছিল যে আমাদের তখন চিন্তা ছিল, কীভাবে আমরা হেল্প করতে পারি ইকোসিস্টেমে। অক্সিজেন ভেন্টিলেটর এনে ৬৪টা জেলার সিভিল সার্জনদের ডিস্ট্রিবিউট করেছিলাম। এছাড়া স্যানিটাইজার এবং অন্যান্য যে পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট সেগুলো দিয়েছিলাম। ওই সময়টা আনসার্টেইন ছিল ব্যবসা, ব্যবসা চালানো তো খুবই ডিফিকাল্ট ছিল। কারণ আমাদের নিজস্ব লোকজনকে রক্ষা করতে হতো। ওই সময় সরকার একটা নির্দেশ দিয়েছিল, সব ফ্যাক্টরি বন্ধ করতে হবে। আমি তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলাম, প্রয়োজনে আমি সব বন্ধ করে দেব কিন্তু সাবান বন্ধ করতে পারব না। সাবান যদি বন্ধ করি তাহলে তো মার্কেটে আসল যে জিনিসটা (হাত ধোয়া) সেটা আর থাকবে না। উনি তখন বিশেষ অনুমোদন দিয়েছিলেন। সে কারণে আমাদের কর্মীরা কারখানায় ছিলেন। রাত-দিন ২৪ ঘণ্ট শুধু সাবানই বানাচ্ছিলাম। ওই সময় অন্য কিছু বিক্রি হয়নি।
ইদানীং হালাল পণ্য নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, ইউনিলিভার বাংলাদেশও কিছু হালাল পণ্য বাংলাদেশে এনেছে। বৈশ্বিকভাবেও বাংলাদেশ এক্সপ্লোর করছে যে কীভাবে হালাল পণ্যের একটা কেন্দ্র হতে পারে। আপনি কীভাবে দেখেন বাংলাদেশের মার্কেট ও বৈশ্বিক মার্কেট?
আসলে এ ট্রেন্ড তো সব জায়গায় আছে। মুসলিম পপুলেশন যত বাড়বে ততই হালালের প্রয়োজন থাকবে। আমাদের দেশে যেগুলো তৈরি হচ্ছে সবকিছুই, বিশেষ করে আমি ইউনিলিভারের কথা বলতে পারি সব হালাল। এখন হয়তো সার্টিফিকেশন অন্য একটা ব্যাপার। কিন্তু এটা একটা বড় অপরচুনিটি সব সময়। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখতে হবে শুধু হালাল বলে বিক্রি করলে হবে না। পণ্যটা কিন্তু ভালো হতে হবে। পণ্যটা যদি ভালো না হয় এবং সেক্ষেত্রে আমি যদি হালাল বলে যাই তাহলে কিন্তু হবে না। ’৯০ সালের শেষের দিকে একটা সাবান হালাল হিসেবে এসে ইউনিলিভারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। উনারা সাকসেসফুল হয়েছিলেন। কারণ উনারা আমাদের চেয়ে ভালো পণ্য বানাতেন। এ কারণেই কিন্তু উনারা সাকসেস হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আমরা ওনাদের চেয়ে ভালো বানিয়েছি, আজকে কিন্তু ওই ব্র্যান্ডটা নেই। হালাল তো অফকোর্স একটা ডিমান্ড থাকে কিন্তু লোকজন যখন ডিটারজেন্ট বা শ্যাম্পু কেনে যদি সেটা তাদের চাহিদামতো কাজ না করে তখন কিন্তু কেউ ওই প্রপোজিশনে বিশ্বাস করবে না।
এবার একটু ইউনিলিভারের বাইরের কথা বলি। আপনি বেশ কিছুদিন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্সের নেতৃত্বেও আছেন। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আনা এবং যারা এরই মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগ করেছেন তাদের স্বার্থ দেখা—এ বিষয়ে কাজ করেছেন সে অভিজ্ঞতাটা যদি বলেন।

আমি চেষ্টা করছি যাতে আমাদের দেশটাকে আরেকটু বিনিয়োগবান্ধব করা যায়। এখানে দু-তিনটা জিনিস আছে, একটা জিনিস যেটা যেকোনো বিনিয়োগকারীকে চিন্তা করতে হবে যে বাংলাদেশে কেন বিনিয়োগ করছে? বাংলাদেশে অনেকে বিনিয়োগ করে কারণটা হচ্ছে বাংলাদেশে বড় মার্কেট আছে। ডোমেস্টিক মার্কেটের জন্য বিনিয়োগ করতে পারেন। একটা বড় ইকোনমি আছে সেটার জন্য করতে পারেন। আরেকটা হচ্ছে বাংলাদেশ এক্সপোর্টের জন্য একটা বড় সোর্স হতে পারে। যে সক্ষমতা আমরা আরএমজিতে (তৈরি পোশাক খাত) প্রমাণ করেছি। কিন্তু যারাই ইনভেস্ট করবেন তাদের জন্য একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে যে বাংলাদেশে ইনভেস্ট করার পর এনভায়রনমেন্টটা কিন্তু সহজ না। অনেক ধৈর্য ধরতে হয়।
আমাদের জন্য যে জিনিসটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে কীভাবে এটাকে আরো মসৃণ করতে পারি। যারা বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন এতগুলো অ্যাপ্রুভাল প্রয়োজন পড়ে। কেউ যদি আজকে বাংলাদেশে আসেন তো উনার কিন্তু প্রথম কোয়েশ্চেন হয় বিডা কী করে? বেজাটা কী করে? বেপজা কী করে? তার মাঝখানে ইপিবিও আছে। এটাকে একটা সিঙ্গেল ফ্রন্টে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা আমাদের গ্রাহক। তারা যখন ইনভেস্ট করবেন অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে। যে কারণে এখন বিডা কিন্তু একটা রিলেশনশিপ টিম তৈরি করেছে। ওদের কাজই কিন্তু এটা যেকোনো ইনভেস্টর আসার পর তারা যেন সব জিনিস স্মুথ করে ফেলতে পারে। ওইটাই আমি চাচ্ছিলাম যে আমরা কীভাবে স্মুথ করতে পারি।
বাংলাদেশে ইউনিলিভারের মতো বড় বৈশ্বিক কোম্পানি আছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আছে। এনার্জি সেক্টর শেভরন আছে। এত বড় গ্লোবাল লিডাররা থাকার পরও বাংলাদেশের এফডিআই কেন এখনো ১-২ বিলিয়নের আশপাশে? যেখানে আমাদের চেয়ে ছোট ইকোনমি অনেক বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।
বাংলাদেশে ইফেক্টিভ ট্যাক্স রেট খুব হাই। একজন বিনিয়োগকারী যদি দেখে এ দেশের ইফেক্টিভ ট্যাক্স রেট ৪০-৫০ শতাংশ, তাহলে এখানে বিনিয়োগ করবেন নাকি ভিয়েতনামে গিয়ে করবেন, যেখানে ইফেক্টিভ ট্যাক্স রেট কম। আমাদের এসব জিনিস সিম্পলিফাই করতে হবে। আরেকটা জিনিস তারা যেন রিটার্নটা ঠিকমতো পায়। বাংলাদেশ থেকে লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন করতে হলে অনেকগুলো পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এগুলো ‘গুড সিগন্যাল’ নয়—এটা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের কাস্টমসে অনেক ঝামেলা এটা সবাই বলেন। কাস্টমসের রোল শুড নট বি ট্যাক্স কালেকশন। কাস্টমসের রোল হবে ট্রেড ফ্যাসিলিটেট করা যে কত দ্রুত আমি পণ্য ছেড়ে দিতে পারছি। আমাদের জরুরি ডিজিটাইজেশন করা দরকার। আমাদের এখনো লাইসেন্সিং করতে হলে সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে যেতে হয়। লাইসেন্সিং করতে কেন এটা করতে হবে? আপনি আমাকে বলবেন যে আমার অডিট করতে হবে। আপনি এসে অডিট করবেন। অপারেশন রান করার জন্য আমার এত জায়গায় কেন ধরনা দিতে হবে।
তার মানে আপনি বলছেন যে বাংলাদেশে বড় অপরচুনিটি আছে কিন্তু অনেক বাধাও আছে। যেগুলো সমাধান না করলে, বাধা দূর না করলে আমরা ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে অনেক কথা শুনব। কিন্তু বাস্তবে…
কিছুই হবে না। এফএমসিজিতে শুধু ইউনিলিভার হচ্ছে সবচেয়ে বড় মাল্টিন্যাশনাল। এরপর যে মাল্টিন্যাশনাল দুটো আছে রেকিট বেনকিজার ও নেসলে। বাকিগুলো কিছু আছে, রিজিওনাল মাল্টিন্যাশনাল কিছু আছে। আপনাকে আমি বলি প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল কেন এ দেশে নেই, হেনকেল কেন এ দেশে নেই? কত এ রকম এফএমসিজি আছে। চিন্তা করে দেখেন হাফ ট্রিলিয়ন ইকোনমি! পৃথিবীর কতটা দেশে এত বড় ইকোনমি আছে? এ দেশের অপরচুনিটি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু আমরাই আমাদের প্রতিবন্ধকতার বড় কারণ।
বাংলাদেশের জন্মের প্রায় ৫৪ বছর তো হলো, আপনারা ফিকি থেকে প্রচুর সেমিনার করেন বা সরকার নিজেও কিছুদিন আগে ইনভেস্টমেন্ট সামিট করেছে। সবাই জানে সমস্যা কোথায়, সমাধান কেন আসে না?
সমাধান করতে হলে খুব আনপপুলার জিনিস করতে হবে। সবকিছু ডিজিটাইজ করতে হবে—এটা তো এমন কিছু অসাধ্য না। আপনার কিছু ফোর্স নিশ্চয়ই ডিজিটাইজেশন চায় না, এমন কিছু লোক থাকবেই। এনবিআরের পলিসি এটা কিন্তু আট বছর ধরে ফিকি বলে আসছিল। এনবিআরে অনেক ডিজিটাইজেশন দরকার যেটা এনবিআর চেয়ারম্যান চেষ্টা করছেন। বিডাকে ডিজিটাইজেশন করা দরকার। আমি যদি ডেবিট আর রেমিট করতে চাই ট্যাফ রয়েলটি বলে একটা ব্যাপার আছে সেটার জন্য বিডার পারমিশন লাগে। এগুলো সব মাল্টিন্যাশনাল করে।
এটার জন্য আপনি যদি বিডাতে যান আপনার দুই-তিন বছর পিছিয়ে থাকে। অথচ জিনিসটা কী? আপনার এখানে বোর্ড রেজিস্ট্রেশন আছে কিনা, আপনার ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট আছে কিনা। এ জিনিসটা করতে আপনার কতদিন লাগা উচিত, তিন মাস। কিন্তু আমরা এগুলো এখনো করছি না। সবাই জানেন এবং এর আগে হয় হাফ হার্টেড আবার এটা চলে যায় আবার ম্যানুয়ালি করে। ইনভেস্ট কোরিয়া অথবা ইনভেস্ট ইন্ডিয়া যদি দেখেন ওটা কারা চালায় জানেন প্রাইভেট সেক্টরের লোক। যেটা এখন বিডা চেয়ারম্যান করছেন, অনেক প্রাইভেট সেক্টর লোক আসছে।
এবার আপনার কথায় চলে আসি, আমি যদি ভুল না করি আপনি সম্ভবত বাংলাদেশী অরিজিন কোনো ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা সিইও যে ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমিতে ইউনিলিভারের মতো একটা কোম্পানির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, কেমন লাগছে আপনার?
এটা একটা নতুন দায়িত্ব, নতুন চ্যালেঞ্জ। নিঃসন্দেহে একটু ওভারওয়েলমিংও। এত বড় একটা দায়িত্ব নিয়ে যাব এখানে অনেক প্রত্যাশা থাকবে, বাংলাদেশেরও একটা নামের ব্যাপার আছে। আমি যে দায়িত্বটা এখন পালন করছি, এটা নেয়ার সময় যেমন লাগছিল, একই রকম ফিল করছি। আমার ওপর যে রেসপনসিবিলিটি দেয়া হয়েছে সেটা যাতে আমি ঠিকমতো করতে পারি—এটাই আমার চাওয়া।
এটা একটা বিরাট আস্থার ব্যাপার যে বাংলাদেশের সিইওদের এ রকম বড় বড় দায়িত্ব দিচ্ছে। এ আস্থাটা আপনি কীভাবে সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে ছড়াবেন যে বাংলাদেশের মানুষ এত বড় বড় কোম্পানির দায়িত্ব নিচ্ছে, যেটা আমরা ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে দেখি। অনেক গ্লোবাল কোম্পানিকে লিড দিচ্ছেন ইন্ডিয়ান সিইওরা। এখন বাংলাদেশী যে তরুণরা তৈরি হচ্ছে বা বিভিন্ন ম্যানেজমেন্ট স্কুলে, বিজনেস স্কুলে পড়াশোনা করছে তাদের উদ্দেশে আপনি কী বলবেন, কীভাবে তৈরি করবে নিজেকে?
একটা সময় বাংলাদেশী মাল্টিন্যাশনালে বাংলাদেশী সিইও ছিল না। এখন কিন্তু এটা খুবই কমন হয়ে গেছে। বাংলাদেশী সিইও নেই এমন মাল্টিন্যাশনাল খুব কমই পাওয়া যাবে। এখন যেটা হবে যে আমরা গ্লোবালি যাব। আমার অনেক আস্থা আমাদের যে এখনকার যে জেনারেশন উঠে আসছে তারা অনেক গ্লোবাল কোম্পানির সিইও হবে। সে ট্যালেন্ট, পটেনশিয়াল সবই আমাদের আছে। আমি তো বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছি, এমন নয় যে আমি বিদেশে বা আইভি লিগের একটা ডিগ্রি নিয়ে এসেছি। আমি খুবই আশাবাদী, নেক্সট জেনারেশন আমাদেরকে আরেকটা লেভেলে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের ইকোনমি কীভাবে ট্রিলিয়ন ডলার হবে? দুই-তিনটা লাইনে বাংলাদেশ নিয়ে যদি কিছু বলেন…
আমি সবসময় অপটিমিস্টিক। এত বাধার পরও আমরা কিন্তু গ্রো করছি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর কত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীর কোনো দেশ এ রকম পাবেন না। এ দেশের মানুষের মধ্যে রেজিলিয়েন্স আছে, ফাইটিং স্পিরিট আছে। আমার ধারণা আমাদের ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি হবে। হয়তো আমরা একটু ধীরে এগোব কিন্তু হবে। না হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ ফান্ডামেন্টালি আমাদের রিসোর্স খুবই শক্তিশালী। যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে বৈশ্বিক যে ইমপ্যাক্ট আমরা করতে পারি, আমাদের রিজিওনাল যে সুপ্রিমেসি সেটার দিকে মনোযোগ দেয়া। সেটার জন্য নেতৃত্ব দরকার। বাংলাদেশকে আমরা যেভাবে দেখছি, ভবিষ্যতে মানুষ যেন সেভাবে না দেখে। ইকোনমিক্যালি ও অন্যান্য সোশ্যাল ইন্ডিকেটরে আমরা যেন একটা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারি। আমার আশা বাংলাদেশ ওখানে যাবে। সূত্র: বনিক বার্তা

