বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রেশমশিল্পকে আধুনিক ও টেকসই করতে গবেষণা, প্রযুক্তি এবং জ্ঞান বিনিময়ে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি রেশমের পুরো উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রাজশাহীতে চীন-বাংলাদেশ কৌশলগত সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে রেশমচাষের গবেষণা ও উন্নয়নবিষয়ক এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম এ পরিকল্পনার কথা জানান।
তিনি বলেন, রেশমশিল্পকে শুধু পুরোনো ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রাখলে চলবে না। আধুনিক গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এ খাতকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী জানান, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে কারখানা চালু করাই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রেশমশিল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কাঁচামাল উৎপাদন থেকে শুরু করে সুতা তৈরি, কাপড় বোনা, পণ্যের নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণ—পুরো ব্যবস্থাকে একই কাঠামোর আওতায় এনে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তুঁতগাছ থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবর্তন
বাংলাদেশের রেশমশিল্পের উন্নয়নে শুধু সুতা উৎপাদনের প্রযুক্তি আধুনিক করলেই হবে না। তুঁতগাছের চাষ, রেশমকীট পালন, গুটি উৎপাদন, সুতা তৈরি, কাপড় বোনা এবং তৈরি পণ্যের বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপের উন্নয়ন প্রয়োজন।
সরকার সেই পুরো উৎপাদনশৃঙ্খলকে আধুনিক করার পরিকল্পনা করছে।
এ জন্য উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল তুঁতগাছের জাত উদ্ভাবন, উন্নত রেশমকীটের জাত তৈরি, রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক পদ্ধতিতে রেশম সুতা উৎপাদন, গুণগত মান যাচাই এবং মূল্য সংযোজিত রেশমপণ্য তৈরির মতো বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো হবে।
এর ফলে শুধু কাঁচা রেশম বা সুতা উৎপাদন নয়, উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ
রেশম উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে চীনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণাকেন্দ্রের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের চেচিয়াং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে অংশ নেয়।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড এবং দেশের অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা হবে।
এর মাধ্যমে শুধু প্রযুক্তি আমদানি নয়, স্থানীয় গবেষণা সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গবেষণাকে মাঠে নিতে হবে
রেশমশিল্পে গবেষণার ফল কৃষকের হাতে পৌঁছানো এবং তা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গবেষক, কৃষক, উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যদি মাঠপর্যায়ে ব্যবহার না হয়, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্য খুব বেশি হবে না।
এ কারণে গবেষণার সঙ্গে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উন্নত জাতের তুঁতগাছ কিংবা রেশমকীট উদ্ভাবনের পাশাপাশি সেগুলো কীভাবে কৃষকের উৎপাদন বাড়াবে এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
রাজশাহীর পুরোনো পরিচয়ে নতুন সম্ভাবনা
রেশমশিল্পের সঙ্গে রাজশাহীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রেশমের জন্যই শহরটি ‘রেশম নগরী’ হিসেবে পরিচিত।
সরকার মনে করছে, পরিকল্পিতভাবে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
রেশমচাষ কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণও বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ রেশমশিল্পকে শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে না দেখে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
রাজশাহী রেশমের স্বীকৃতি কাজে লাগানোর চেষ্টা
রাজশাহী রেশম ইতোমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। এই স্বীকৃতিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে চায় সরকার।
এ জন্য রাজশাহী রেশমের মান আরও উন্নত করার পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করা এবং বিদেশি বাজারে অবস্থান তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এখানে সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি। শুধু সাধারণ রেশম কাপড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পোশাক, শাল, শাড়ি, গৃহসজ্জার সামগ্রী ও অন্যান্য নকশাদার পণ্য তৈরি করা গেলে একই পরিমাণ কাঁচামাল থেকে বেশি আয় করা সম্ভব।
টেকসই উৎপাদনেও গুরুত্ব
রেশমশিল্পের পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিল্পটিকে আরও পরিবেশবান্ধব করার প্রয়োজন রয়েছে। পানি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং কাঁচামাল ব্যবহারে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর চাপও কমবে।
বর্তমান বিশ্ববাজারে পণ্যের মানের পাশাপাশি উৎপাদন কতটা পরিবেশবান্ধব, সেটিও ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের রেশমশিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ঐতিহ্য থেকে রপ্তানিমুখী শিল্প
বাংলাদেশের রেশমশিল্পের বড় শক্তি এর ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য। কিন্তু ঐতিহ্য একা কোনো শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা, বিনিয়োগ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ঐতিহ্যকে যুক্ত করতে পারলেই এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সরকারের বর্তমান পরিকল্পনায় তাই উৎপাদনের পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীর রেশমশিল্প নতুন করে গতি পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর একটি নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সাফল্যের জন্য পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। গবেষণার ফল কৃষকের কাছে পৌঁছানো, উন্নত জাতের কাঁচামাল সহজলভ্য করা, উৎপাদন খরচ কমানো, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রেশমের ব্র্যান্ড তৈরি—সবগুলো কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
তাহলেই ‘রেশম নগরী’ রাজশাহীর পুরোনো পরিচয় শুধু ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে না; বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রেশমশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

