বাংলাদেশের কারুশিল্প অর্থনীতি কোনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি এখনো একটি জীবন্ত উৎপাদন ব্যবস্থা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ শিল্পকর্ম আজও সতেজ এবং জনপ্রিয়। নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, সিরাজগঞ্জের তাঁত, রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, আর সিলেট ও ঝালকাঠির শীতলপাটি—এসব কারুশিল্প শুধু ঐতিহ্য নয়, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিটি পণ্য নিখুঁত কারিগরী এবং আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ।
সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ কারুশিল্পের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজাইনের সংমিশ্রণে ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে নতুন বাজারে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শুধু শিল্পীরা উপকৃত হচ্ছেন না, বিদেশি ক্রেতাদের আকর্ষণও বাড়ছে। বাংলাদেশের কারুশিল্পের এই জীবন্ত অর্থনীতি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রপ্তানি আয় দুটোই সমৃদ্ধ করছে। প্রত্যেকটি হস্তশিল্প আমাদের ঐতিহ্য, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচায়ক।
থাইল্যান্ডের ওটপ মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে বিদ্যমান শক্তিকে সংগঠিত করা সহজ। মূল কৌশল হলো প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি স্বাক্ষর—পণ্য নির্বাচন, মাননিয়ন্ত্রণ ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা এবং উৎপাদকদের ডিজাইন সহায়তা, অর্ডার-ভিত্তিক অর্থায়ন, লজিস্টিকস ও বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা। থাইল্যান্ডের মতো স্টার, রেটিং ও সার্টিফিকেশন চালু করলে গুণমান নিশ্চয়তা দেখা যায়, আর কারুশিল্প ট্যুরিজম গ্রামীণ অর্থনীতিতে অতিরিক্ত আয় সৃষ্টি করে। আমাদের প্রেক্ষাপটে এর মানে গ্রামভিত্তিক নারী নেতৃত্বাধীন উৎপাদনকে শিল্পনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করা।
এই নীতির ভিত্তিমালাও তৈরি আছে। সাম্প্রতিক ম্যাপিং অনুযায়ী দেশে ৭৩ হাজারের বেশি হ্যান্ডিক্র্যাফট প্রতিষ্ঠান আছে, যার ৯৭ শতাংশের বেশি ঘরভিত্তিক; ১ দশমিক ৪৮ লক্ষাধিক মানুষ যুক্ত; মালিকানায় নারীর অংশ প্রায় ৫১ শতাংশ, আর শ্রমশক্তিতেও নারীরই আধিক্য। হ্যান্ডলুম সেন্সাস ২০১৮ দেখায় দেশে ১ লাখ ১৬ হাজার ১১৭ ইউনিটে ২ লাখ ৯০ হাজার ২৮২ তাঁত রয়েছে (সক্রিয় প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৭২৩); বড় অংশ সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁসহ ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে। হ্যান্ডিক্র্যাফট রফতানি এখনো ছোট (প্রায় ২৯ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার, অর্থবছর ২০২২-২৩), কিন্তু জিআই ও ইউনেস্কো স্বীকৃতির কারণে ব্র্যান্ড প্রিমিয়ামের সম্ভাবনা বড় জামদানি (ইউনেস্কো ২০১৩; জিআই ২০১৬), টাঙ্গাইল শাড়ি (জিআই ২০২৪), রাজশাহী সিল্ক (জিআই ২০২১), শীতলপাটি (ইউনেস্কো ২০১৭), শতরঞ্জি (জিআই ২০২১) ইত্যাদি এর উদাহরণ। এসব শুধু স্বীকৃতি ট্রফি নয়, ব্র্যান্ড প্রিমিয়াম দামের ক্ষমতা বাড়ায়, যদি মানচিহ্ন ও সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করা যায়।
‘এক গ্রাম এক পণ্য’ বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে? প্রতিটি অংশগ্রহণকারী গ্রামে নারী অগ্রাধিকার দিয়ে উৎপাদক গ্রুপ গঠন হবে। তারা সবাই মিলে ফ্ল্যাগশিপ পণ্য বেছে নেবে, ডিজাইন-স্ট্যান্ডার্ড আর মাননিয়ন্ত্রণে একমত হবে এবং ১-৫ স্টার রেটিং (থাইল্যান্ড মডেল অনুসারে) নেবে। জেলা স্তরে কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি) গড়ে উঠবে: ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং, টেস্টিং, প্যাকেজিং, বারকোডিং ও বেসিক কমপ্লায়েন্সের জন্য। যাতে ছোট ইউনিটও বড় অর্ডার তুলতে পারে। অর্থায়ন হবে অর্ডার-লিংকড, স্বল্পমেয়াদি ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, ইনভয়েস, ডিসকাউন্টিং, ছোট যন্ত্রপাতি ঋণ; নারী উদ্যোক্তার জন্য আলাদা কোটা। বাজার সংযোগে থাকবে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ ই-মার্কেটপ্লেস, এক্সপোর্ট-বায়ার এগ্রিগেশন, জাতীয় মেলা ও বিদেশী ফেয়ারে নিয়মিত অংশগ্রহণ। সরকারি ক্রয়ে স্কুল ইউনিফর্ম, হাসপাতালের লিনেন, প্রটোকল, গিফট, এসবের একটি অংশ সার্টিফায়েড গ্রাম উৎপাদকদের জন্য বরাদ্দ থাকবে, যাতে নিয়মিত চাহিদা তৈরি হয়।
এলাকা নির্দিষ্ট উদাহরণ পরিকল্পনাকে স্পষ্ট করে। নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁয় জামদানির জিআই লোগো ও কিউআর ট্রেসেবিলিটি, ডিজাইন-ল্যাব, আর সিএফসিতে কালারফাস্টনেস-টেস্টিং চালু হলে দাম প্রিমিয়াম স্থায়ী হয়। টাঙ্গাইলে জিআই চিহ্নিত শাড়ি গ্রামগুলোতে স্ট্যান্ডার্ড ডাইং প্যাকেজিং আর নারী—প্রথম মূলধন উইন্ডো বড় অর্ডার তুলতে সহায়তা করবে সে। সিরাজগঞ্জে লুমের ঘনত্ব কাজে লাগিয়ে হোম টেক্সটাইল/হসপিটালিটি লিনেন রফতানিযোগ্য করা যায়, যদি ব্যাচ-কনসিস্ট্যান্সি ও মানচিহ্ন নিশ্চিত হয়। রাজশাহীতে সিল্কের জিআই ভিত্তিতে ‘সিল্ক সিটি’ ব্র্যান্ডিং, ডিজাইনার টাইআপ ও কারুশিল্প-ট্যুরিজম পুরো ভ্যালুচেইনে আয় ছড়াবে। রংপুরে শতরঞ্জিকে বড় সাইজ, ইকো ফাইবার লাইন ও ইউরোপীয় হোম-ডেকর-বায়ারের সঙ্গে এগ্রিগেটেড অর্ডারে নিলে দ্রুত স্কেল আসে। ঝালকাঠি ও নলছিটিতে শীতলপাটিকে মডেল 1V1P ভিলেজ বানাতে ফিনিশিং-স্ট্যান্ডার্ড ও লজিস্টিকস ঠিক করাটাই প্রথম কাজ। ঝালকাঠিতে বিএনপির স্থানীয় সম্পৃক্ততা এরই মধ্যে এই পথে এগোচ্ছে।
সমতা এখানে নকশারই অংশ। ঘরভিত্তিক, নারীনির্ভর উৎপাদনকে নারী—প্রথম অর্থায়ন ও হোম বেজড সেফটি স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমকে বৈতনিক উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা যাবে। সহজবোধ্য মান-সিল ও জিআই লোগো ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত হলে ব্র্যান্ড-ভ্যালু আর মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে যাবে না; দাম যাবে নারী উৎপাদকের হাতে। ট্রেনিং হবে ডিজাইন-প্যাটার্ন, কালার-ম্যাচিং, ফিনিশিং, কস্টিং, ডিজিটাল-ক্যাটালগ, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট, সবকিছুই গ্রামের ভেতর, নারীর সময়-সুবিধা মেনে।
কর্মসংস্থানের অংকটাও বাস্তব ও দ্রুত। ধরা যাক, প্রথম ধাপে ২৫০-৩০০ অগ্রাধিকার গ্রামে গড়ে ১০০টি করে মাইক্রো উদ্যোগ ফর্মালাইজ হলো এবং প্রতিটিতে পাঁচটি করে স্থায়ী কর্মসংস্থান হলো তাহলে ১ দশকিম ২৫ থেকে ১ দশমিক ৫০ লাখ সরাসরি চাকরি খুব অল্প সময়ে সৃষ্টি সম্ভব, যার বড় অংশ নারী। গ্রামগুলো ৪-৫ স্টার অর্জন করলে সুতা-রঙ-কেমিক্যাল, প্যাকেজিং, লজিস্টিকস, ডিজিটাল সেলস, মেইনটেন্যান্স ও ট্যুরিজম—এসব জুড়ে আরো কাজ তৈরি হবে। দেশের ১৭৭টি এসএমই ক্লাস্টার (তার মধ্যে ৩৮টি হ্যান্ডিক্র্যাফট) জুড়ে এই মডেল স্কেল করলে এক কোটি কর্মসংস্থানের জাতীয় লক্ষ্য পূরণে 1V1P-BD শক্তিশালী পাইপলাইন হয়ে উঠবে।
এ কৌশল জাতীয় গৌরবও ফিরিয়ে আনে। জিআই সিল ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ, যখন তা নিয়মিত মান আর স্বচ্ছ উৎসের সঙ্গে বাঁধা থাকে। যখন একটি জামদানি শাড়িতে গ্রামের ট্রেস কোড থাকবে বা একটি শীতলপাটিতে কোয়ালিটি-স্ট্যাম্প থাকবে, তখন ঐতিহ্য প্রিমিয়ামে পরিণত হয়, যে প্রিমিয়াম ঘরের আয় বাড়ায়, সন্তানের পড়ার খরচ চালায়, আর পরের প্রজন্মের হাতে দক্ষতা পৌঁছে দেয়। গৌরব তখন কাগজের শিরোনাম নয়; সম্মানজনক পারিশ্রমিক।
নীতি ও বাস্তবায়ন—এ বছরেই কি করা যায়? সরকার এক গ্রাম, এক পণ্য নীতি ঘোষণা করে সহজ যোগ্যতা ঠিক করতে পারে—প্রতি গ্রামে একটি পণ্য, নারী নেতৃত্ব অগ্রাধিকার। জেলা স্তরে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টিসিপেশন (পিপিপি) মডেলে সিএফসি স্থাপন করে রফতানি মানদণ্ডে আনা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ডার-লিংকড ওয়ার্কিং, ক্যাপিটাল ও ইনভয়েস ডিসকাউন্টিং দেবে—হালকা কাগজপত্র, তাঁত চক্রের সঙ্গে মিলিয়ে ঋণের মেয়াদ। জাতীয় ই-মার্কেট প্লেসে রেটেড পণ্য প্রদর্শন হবে; সরকারি ক্রয়ে সার্টিফায়েড গ্রাম উৎপাদকদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা নিশ্চিত করা যাবে। পর্যটন সংস্থা জামদানি, শীতলপাটি, শতরঞ্জি, সিল্ক—এ রুটগুলো ম্যাপ করে ক্রাফট ও ট্যুরিজম বাড়াতে পারে।
পরিশেষে পুঁজি, কোচিং, সার্টিফিকেশন ও কন্ট্রাক্ট—এই চার স্তম্ভে শৃঙ্খলাভাবে এগোতে পারলে কারুশিল্প অর্থনীতি হবে সমতার ও নারী শক্তির ওপর দাঁড়ানো প্রবৃদ্ধির স্তম্ভ। এক গ্রাম, এক পণ্য আমাদের গ্রামের দক্ষতাকে মর্যাদাপূর্ণ জীবিকায় রূপ দেবে, বিএনপির এক কোটি লোকের চাকরি অঙ্গীকারকে গতিশীল করবে এবং ১ ট্রিলিয়ন ডলারের দিগন্তে এগোনো বাংলাদেশকে গৌরবের নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা।
সূত্র: বনিক বার্তা

