একজন ব্যক্তির কারসাজিতে দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টানা ছয় বছর ধরে লোকসানের বোঝা টেনে যাচ্ছে। গত বছরের শেষে খাতের সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে পুরো খাতের লোকসান প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংকবহির্ভূত খাতের দুরবস্থা শুরু হয় ২০১৪ সালে পি কে হালদারের হাত ধরে। একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি হিসেবে বসে তিনি চারটি প্রতিষ্ঠান নামে-বেনামে নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল ঋণ বের করেন তিনি। এই ঋণ অনিয়মের কারণে খাতটি সংকটের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি দেশীয় এবং ১৩টি যৌথ মালিকানাধীন। উচ্চ খেলাপি ঋণ ও টাকা ফেরত দিতে না পারার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ পাঠায়। এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে। বাকি ৯টির বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের পক্ষ থেকেও সায় এসেছে। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যাংক তহবিল গঠন করবে।
খাতের বিপুল লোকসানের মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠান মুনাফা করছে। এর মধ্যে রয়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স, ইডকল, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল হাউজিং। অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান বিপুল লোকসান করায় খাতের সম্মিলিত লোকসান সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
নোটিশ পাওয়া ২০টি প্রতিষ্ঠান হলো: সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামিক ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স, উত্তরা ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও এফএএস ফাইন্যান্স।
বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৯টি প্রতিষ্ঠান: এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, আভিভা ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স।
নানা অনিয়মের কারণে খেলাপি ঋণ ও লোকসান বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭.৯ শতাংশ। ২০২০ সালে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়। ২০২৪ সালের শেষে এটি ৩৩.৮৩ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি। সর্বশেষ খাত সম্মিলিতভাবে ২০১৮ সালে মুনাফা করেছিল ৮৩০ কোটি টাকা। এরপর ২০১৯ সালে লোকসান হয় ২ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে লোকসান বেড়ে ৩ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ৮৬৩ কোটি, বিডি ফাইন্যান্স ৭৮৩ কোটি, বে লিজিং ৪৩৮ কোটি, আইআইডিএফসি ১৫৮ কোটি, হজ ফাইন্যান্স ১৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এছাড়া সিভিসি ফাইন্যান্স ৪১ কোটি, মাইডাস ফাইন্যান্স ৩২ কোটি, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স ৭২ কোটি, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স ৪৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
বিপরীতভাবে, কিছু প্রতিষ্ঠান মুনাফা করছে। আইডিএলসি ফাইন্যান্স ২০০ কোটি, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ৩৬ কোটি, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স ২১ কোটি, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স ১০১ কোটি, ইডকল ১৭১ কোটি এবং ন্যাশনাল হাউজিং ২৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ ও টেকসই অর্থায়নেও সক্রিয়। আইডিএলসি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পি কে হালদারের দখলে আসে। তিনি নামে-বেনামে কোম্পানি খোলেন, শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কেনেন এবং প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে অর্থ বের করেন। বিদেশেও কোম্পানি খুলে অর্থ পাচার করেন। চারটি মূল প্রতিষ্ঠান ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি। বর্তমানে এগুলোর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স (বর্তমানে আভিভা ফাইন্যান্স) ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ সরিয়ে নেন হালদার। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি তৎকালীন নেতৃত্বের নীরবতা এই সুযোগ দিয়েছে। ২০১৯ সালে গ্রাহক টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। পরে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খেটেন। বর্তমানে তিনি অন্য দেশে আছেন।
বিএলএফসিএর সাবেক চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন তদারকির বাইরে ছিল। সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান খারাপ হয়ে গেছে। এখন একীভূত বা মূলধন জোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক করতে হবে। সঠিক বিধিবিধানেও খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, ভালো প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতের মতো বাংলাদেশেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

