আগামী ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চায় ঢাকা। সফরকে সামনে রেখে বেইজিংয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনের প্রস্তুতিও চলছে।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যান শিল্প বিকাশে চীনের সহযোগিতা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে ডেভেলপার হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পিত এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের হান্ডা গ্রুপকে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতিও চলছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভূমি উন্নয়নের পর মালিকানার ৭০ শতাংশ থাকবে চীনের হাতে এবং ৩০ শতাংশ থাকবে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মালিকানা কাঠামোতে ৭৬ শতাংশ জাপান ও ২৪ শতাংশ বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের বিষয়টি বিশ্লেষণ করে এই নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে ডেভেলপার নিয়োগের প্রস্তাবটি আজ অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উঠতে পারে। এর আগে গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।
চীন সফরে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার উন্নয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, ক্রস বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম এবং গ্রিন মাইনিং ও খনিজ খাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তাব আসতে পারে। বাংলাদেশ ‘পান্ডা বন্ড’ নামে চীনা মুদ্রাভিত্তিক বন্ড চালুর বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার উন্নয়ন ব্যাংক মূলত আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো ও শিল্প উন্নয়নে অর্থায়ন করে থাকে। এই কাঠামোতে ভারত, রাশিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশ যুক্ত রয়েছে। সংস্থাটির লক্ষ্য জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো।
ক্রস বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম চীনা মুদ্রায় আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তির একটি অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে। এ বিষয়ে চীনের এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে ঘোষিত গ্রিন মাইনিং ও খনিজ সহযোগিতা উদ্যোগে বাংলাদেশকে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে চীন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এছাড়া চীন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, মুদ্রা অদলবদল চুক্তি, বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনে চীন বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে এই দুই খাতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে কর ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প ও বৈদ্যুতিক যান শিল্পে চীনা বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর শুরু হবে। পাশাপাশি দুই দেশ যৌথ গবেষণাও চালাবে।
নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী হাসপাতাল স্থাপনের জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রকল্পে চীন অনুদান আকারে অর্থায়ন করতে পারে। এছাড়া মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পেও চীনের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তুতি রয়েছে। আগের সময়কালে এই প্রকল্পে অগ্রগতি হলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা যায়। তিস্তা ব্যারেজ, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন চাওয়া হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকা সংগ্রহ করেছে।
বর্তমানে চীনের ঋণে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি বড় প্রকল্প বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সফরকালে এসব প্রকল্পের ঋণ ছাড় দ্রুত করা এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার অনুরোধ জানানো হবে।
এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, গ্রিড শক্তিশালীকরণ, ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রাজশাহী ওয়াসার পানি শোধন প্রকল্প এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য চারটি জাহাজ সংগ্রহ প্রকল্প।

