বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্বস্তিদায়ক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ঋণ সহায়তার ফলে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩১৪৩২ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ এখন ২৬৪৫০ দশমিক ০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২০ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ২০২১ সালেরআগস্ট মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ ছিল। ২০২২ সালেরআগস্টেও রিজার্ভ ছিল ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার, যা সর্বোচ্চ। পরবর্তীতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাচার, অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ ইত্যাদি কারণে রিজার্ভের পরিমাণ কমে যায়।
তারপর ২০২৩ সালের আগস্টে রিজার্ভ ২৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে ছিল, যা পরের মাসে ২১ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৪ সালেরজুলাই মাস শেষে গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ২০ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যখন নিট রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। তারপর ২০২৫ সালের আগস্টে শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার পৌঁছেছে।
এই ইতিবাচক সূচকগুলো অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দিলেও আশ্চর্যের বিষয় হলো টাকার মান ডলারের বিপরীতে শক্ত হচ্ছে না; বরং ক্রমেই অবমূল্যায়নের দিকে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রিজার্ভ বাড়লেও কেন টাকা দুর্বল রয়ে যাচ্ছে? অবস্থা এমন যে, টাকার এই অবমূল্যায়ন ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই বাজার থেকে ডলার কিনতে শুরু করেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলার সস্তা হলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতো। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মহামারির পর থেকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং নিত্যপণ্যের দামও ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে চলে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা হ্রাস পেলেও সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি কিন্তু কমেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখতে চাই। ডলারের দরের বড় উত্থান বা পতন কোনোটিই অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। দর খুব কমে গেলে রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আবার প্রবাসীরা আয় পাঠাতেও নিরুৎসাহিত হতে পারেন।’
তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই নীতি ভোক্তাদের জন্য সম্ভাব্য স্বস্তি হাতছাড়া করছে। তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ডলারের দর বৃদ্ধি। এখন যখন দর কমছে, তখন সেটিকে কাজে লাগানো উচিত।’ তার মতে, ডলারের দর ১২০ থেকে ১১০ টাকার কাছাকাছি নামানো গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের প্রভাব পড়তো। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তখন সেটি কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না?’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি জুনের ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি। জুনের হার ছিল গত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং তখন টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমেছিল। তবে সেই স্বস্তির পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আখতার হোসেন বলেছেন, সহসাই মূল্যস্ফীতি কমবে না এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে সুদে স্বস্তি পাওয়াও সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতিতে যদি বেসরকারি বিনিয়োগ ধাক্কা খায়, তবে তা সামাল দিতে সরকারকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।
রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিটেন্স- যোদ্ধারা দেশে পাঠিয়েছেন ২৪৭ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। আগস্টের প্রথম ২৭ দিনে এসেছে আরও ২০৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স যা গত বছরের তুলনায়ও বেশি। রফতানি আয়ের দিকেও ইতিবাচক চিত্র। জুলাই মাসে পণ্য রফতানি হয়েছে ৪৭৭ কোটি ডলার, যা গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ।
এমন এক প্রেক্ষাপটে বাজারে ডলারের প্রাচুর্য থাকলেও টাকার মান বাড়ছে না, বরং ডলারের বিপরীতে ক্রমেই অবমূল্যায়িত হচ্ছে। গত এক বছরে টাকার মান কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বর্তমানে বাজারে প্রতি ডলারের দাম ১২২ টাকা ছাড়িয়েছে, যেখানে এক বছর আগে ছিল ১১২ টাকা। প্রশ্ন উঠছে, যখন ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট নেই, রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন অতিক্রম করেছে, প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তখন কেন টাকার মান বাড়ছে না?
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে দেখা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের চিত্র আরও দুর্বল মনে হয়। গত এক বছরে ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়া কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ডং কমেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারতের রুপি কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, চীনের ইউয়ান কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ, ফিলিপাইনের পেসো কমেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানি রুপি কমেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, আর শ্রীলঙ্কান রুপি বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ান রিয়েল বেড়েছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব দেশ অতীতে বড় সংকটে পড়েছিল তারাও ধীরে ধীরে মুদ্রাকে স্থিতিশীল করেছে। অথচ বাংলাদেশেই অবমূল্যায়ন হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত হারে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও টাকার মান সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত: রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লেও এর গুণমান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি ঋণ ও স্বল্পমেয়াদি দায় পরিশোধে ব্যয় হওয়ায় এই রিজার্ভ দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারেনি। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির বিল মেটাতে রিজার্ভ ব্যবহার হওয়ায় প্রকৃত অর্থে বাজারে এর প্রভাব সীমিত।
দ্বিতীয়ত: উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অভ্যন্তরে টাকার ক্রয়ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। জুলাই ২০২৫-এ মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ, আর ১২ মাসের গড় ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর ফলে টাকার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গিয়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে টাকার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে সুদের হার তুলনামূলকভাবে কার্যকর না হওয়ায় টাকার প্রতি আকর্ষণ আরও হ্রাস পেয়েছে।
তৃতীয়ত: বাজারের স্বাভাবিক আচরণও একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেও বাজারে ডলারের চাহিদা সেই আয়ের তুলনায় বেশি রয়ে গেছে। এর ফলে চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ডলারের দাম বাড়তে থাকে, আর টাকার মান আরও দুর্বল হয়।
চতুর্থত: নীতিগত সীমাবদ্ধতাও প্রভাব ফেলেছে। অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি ডলার কিনে মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো। এখন সেই ভূমিকা সীমিত। ফলে বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
পঞ্চমত: হুন্ডি ও কারেন্সি গ্যাপের ফলে টাকার মান দুর্বল হচ্ছে। প্রকৃত বিনিময় হার ও বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ডলারের প্রকৃত দর ছিল ১০২ টাকা ৫ পয়সা, অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২২ টাকায়। এই ২০ টাকার ব্যবধান রেমিট্যান্স ও রফতানিকারকদের জন্য লাভজনক হলেও আমদানিকারক ও ভোক্তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
এছাড়া মুদ্রানীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির কার্যকর হতে সময় লাগে। ফলে নীতিগত সমন্বয় সঠিক হলেও বাজারে এর প্রভাব দ্রুত দেখা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসতে দেরি হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় সংকট কাটিয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে। তারা বহুমুখী আয়ের উৎস তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সীমিত আয়ের উৎস রফতানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। স্বল্পমেয়াদি সুবিধার দিকে বেশি নজর দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কৌশল অনুপস্থিত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রিজার্ভ বৃদ্ধির ইতিবাচক বার্তা থাকা সত্ত্বেও টাকার দুর্বলতা কাটেনি। রিজার্ভের প্রকৃত গুণমান, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ, সুদের হারের অকার্যকারিতা, বাজারের অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ এবং নীতিগত প্রভাব কার্যকর হতে সময় নেওয়া, এসব কারণ মিলেই টাকার মান জুলাই ২০২৫-এসেও শক্তিশালী হতে পারেনি।

