অসম্ভব পাগলাটে আর আনপ্রেডিক্টেবল স্বভাবের মানুষ তিনি। যখন যা খুশি, তাই করে বসেন। সম্ভবত আগেকার রাজরাজড়াদের মতো আচরণে বিশ্বাসী। তিনি চান সবাই তাঁকে তোয়াজ করে চলুক। তবেই হয়তো খুশি হয়ে অনেক কিছু দিতে পারেন।
বর্তমানে আমরা আলোচিত বৈশ্বিক শুল্ক যুদ্ধে কথা বলছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন করে আমদানি পণ্যের ওপর কঠোর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন। এসব শুল্ক ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আরও অন্তত ২৫ দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের তথ্য জানা গেছে। যেখানে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ, পরে অবশ্য রাশিয়ার তেল কেনায় ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন ট্রাম্প। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্ক দাঁড়াল ৫০-শতাংশে। পাকিস্তানের ওপর ১৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ১৯ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ওপর ১৯ শতাংশ, মিয়ানমারের ওপর ৪০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যা হোক, বিশ্বায়নের যুগে বাণিজ্যনীতি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এটি ভূরাজনৈতিক কৌশল, প্রযুক্তিগত আধিপত্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি একদিকে যেমন যুক্ত্ররাষ্ট্রে রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে তাদের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা এবং বিশ্লেষকরা একে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীত মেরুর দেশগুলো এক হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি তৈরি করছে। চলমান সপ্তাহে চীনের তিয়ানজিনে চীন, রাশিয়া আর ভারতের মতো সরকারপ্রধানকে এক টেবিলে বসা তারই ইঙ্গিত বহন করে।
বৈঠকে তিন নেতা বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিজ দেশে যেমন সমালোচিত হচ্ছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের অস্থিরতা তৈরি করছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নতুন শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। এক বছর আগেও এ হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সাত গুণের বেশি গড় শুল্ক বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের মাসের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকরা একে শুল্ক আরোপজনিত প্রাথমিক প্রভাব বলেই মনে করছেন। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যমূল্য বাড়তে শুরু করেছে। ট্রাম্পের দাবি, এ শুল্কের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং দেশীয় শিল্প খাতকে সুরক্ষা দিতে চান। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ উৎপাদনশীলতা বাড়াবে; যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাবে। বাস্তবে এটা সম্ভব হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্য বিশ্লেষক এবং কিছু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এ শুল্কনীতিকে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন।
তাদের মতে, এই নীতির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, ক্রয়ক্ষমতা কমবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে নতুন সংকট দেখা দেবে। ট্রাম্পের এই নীতি হয়তো নতুন অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্রিকসের উত্থান দেখা যেতে পারে। ডলারের বিপরীতে অন্য মুদ্রার প্রচলন বাড়তে পারে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য জোরদার হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের এক নম্বর ভোক্তাবাজার। বিশ্বের সব দেশ এই বাজারে স্বভাবতই প্রবেশ করতে চাইবে। তারপরও নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক মেরূকরণের সূচনা হলে ক্ষতি কী? সূত্র: সমকাল

