দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে এক জটিল ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক দরকষাকষি শুরু হয়েছে।
একদিকে, ভারতের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের যেমন নতুন সুযোগ, তেমনি এই সফর অনুষ্ঠিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে যোগাযোগের পথ সংকুচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকাও নয়াদিল্লিকে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক ব্যক্তিদের দ্রুত প্রত্যর্পণসহ একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির কঠোর শর্ত বেঁধে দিয়েছে। এছাড়াও, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই টানাপোড়েন ও শর্তের আড়ালে চীন নীরবে ঢাকার সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক জোরদার করে চলেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ কেবল তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই পুনর্গঠন করছে না, বরং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের এক অপরিহার্য ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু (Geopolitical Pivot) হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের প্রথম দিকের সফর হিসেবে চীন ও মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটি কৌশলগত বার্তা ছিল।
দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে ভারসাম্য বজায় রাখতে ঢাকা এখন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করেছে, যা প্রথাগত একমুখী পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে বহুমাত্রিক বন্ধুত্বের জোটে (Multi-alignment) প্রবেশের ইঙ্গিত দেয়। তবে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত থাকায় (ভারত-বাংলাদেশ) দুই দেশই শেষ পর্যন্ত শীর্ষ পর্যায়ের সংলাপে বসতে বাধ্য হচ্ছে।
এই শীর্ষ বৈঠকের আড়ালে ঢাকার পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সফরটির মূল দরকষাকষির ভিত্তি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত পাঠানো, শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্তদের হস্তান্তর করা এবং ভারতের মাটিতে বসে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্পূর্ণ বন্ধ করাই এখন বাংলাদেশের মূল দাবি।
শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া ভারতের জন্য একধরনের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করলেও, বাংলাদেশের পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে এটি ভারতের ‘সফট পাওয়ার’ বা ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ফলে, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অনুরোধগুলো তাদের জাতীয় আইনি কাঠামোর অধীনে পর্যালোচনার কথা বললেও, ঢাকাকে আস্থায় আনতে ভারতীয় দূতরা নয়াদিল্লির সর্বোচ্চ সম্মানজনক অভ্যর্থনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কূটনীতিক বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দরকষাকষির মূল ক্ষেত্রটি মূলত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার লড়াই। ভারতের সংবেদনশীল ‘সিলিগুরি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা রক্ষা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সহযোগিতা নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রভাব বিস্তার ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে, চীনা অর্থায়নে তিস্তা নদীর সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বা চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করে নয়াদিল্লি। তাই, ভারত চায় বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য ট্রানজিট চুক্তি বজায় রেখে বঙ্গোপসাগরে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার রোধ করা।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই ত্রিমুখী সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতের জন্য বাংলাদেশের বাজার, সড়ক ও নদীবন্দরভিত্তিক ট্রানজিট সুবিধা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ বা পণ্য পরিবহনের রুট অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিল্পখাতে ভারী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) এবং সহজ শর্তের ঋণ অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ভারত যদি তাদের ঐতিহ্যগত প্রভাব ব্যবহার করে বাণিজ্যিক নমনীয়তা বা সীমান্ত হত্যার মতো ইস্যুগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন না আনে, তবে ঢাকা স্বাভাবিকভাবেই চীন কেন্দ্রিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এ কারণে ঢাকা এখন কেবল নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক স্বার্থে রূপান্তর করার কৌশল অবলম্বন করছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা ও নয়াদিল্লির শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘গেম থিওরি’ অনুসরণ করে দরকষাকষির চূড়ান্ত টেবিলে রয়েছেন। বিশ্বমানের ভূ-রাজনৈতিক বিচারে, বাংলাদেশ এখন আর বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিতে চালকের আসনে থাকা একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শক্তি।
তারেক রহমানের এই নয়াদিল্লি সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে ভারত তাদের প্রথাগত আঞ্চলিক কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক মর্যাদা ও আইনি শর্ত মেনে নিতে কতটা নমনীয়তা দেখায় তার ওপর। সংবেদনশীল আইনি ও রাজনৈতিক চুক্তিতে ভারত যদি সম্মানজনক সমাধান দিতে পারে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনবে; অন্যথায়, এই কূটনৈতিক দূরত্ব বাংলাদেশকে চীন ও অন্যান্য বৈশ্বিক পরাশক্তির দিকে আরও গভীরভাবে ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করবে।
- এফ. আর. ইমরান: সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক

