ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করে জুন ২০২৮-এর মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ (সিআরসিসি)। মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান উ ইয়ানকুনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল কাজের গতি বাড়ানোর এই অঙ্গীকার করে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুলাইয়ে অনুমোদিত প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির সময়সীমা জুন ২০৩০ করা হয়েছে। ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যটি আপাতত ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি হিসেবেই দেখতে হবে।
বৈঠকে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ প্রকল্পের নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর ওপর জোর দেন। সিআরসিসির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার, শ্রমিক ও নির্মাণ সরঞ্জাম বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ জোরদারের মাধ্যমে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি নির্মাণাধীন এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড স্থাপন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু ঢাকার যানজট কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর এলাকা থেকে আবদুল্লাহপুর, আশুলিয়া হয়ে সাভারের ইপিজেড পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি চালু হলে সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর ও ইপিজেডের শিল্পাঞ্চল থেকে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ঢাকা-আশুলিয়া করিডোরের ওপর চাপ কমিয়ে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী যানবাহনের জন্য একটি বিকল্প দ্রুতগতির পথ তৈরি হবে।
অর্থনীতির দিক থেকে এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে শিল্প ও পণ্য পরিবহনে। আশুলিয়া-সাভার অঞ্চলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা রয়েছে। এই এলাকার সড়ক যোগাযোগে দীর্ঘ যানজট হলে শুধু কর্মীদের যাতায়াত নয়, কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছানো এবং তৈরি পণ্য বন্দর বা অন্যান্য গন্তব্যে পাঠাতেও সময় ও খরচ বাড়ে। একটি নিরবচ্ছিন্ন দ্রুতগতির সড়ক তৈরি হলে সেই অতিরিক্ত সময় কমানো সম্ভব। অর্থাৎ এক্সপ্রেসওয়েটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি সড়ক প্রকল্প নয়, শিল্পাঞ্চলের সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর অবকাঠামো হিসেবেও কাজ করতে পারে।
২০১৭ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা এবং কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল জুন ২০২২। পরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা হয় এবং সময় বাড়িয়ে জুন ২০২৬ করা হয়। এরপর গত জুলাইয়ে একনেক প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন করে। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা প্রথম সংশোধিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময়মূল্যের বড় পরিবর্তন, নকশায় পরিবর্তন, অতিরিক্ত প্রকৌশলকাজ, জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং নতুন কিছু অবকাঠামোগত সংযোজন রয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনীতে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ, বাইপাইল এলাকায় ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ রেল যোগাযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিছু নকশাগত পরিবর্তনও যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি যত এগিয়েছে, এর বাস্তবায়ন ব্যয়ও তত বেড়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সিআরসিসি যদি জুন ২০২৮-এর মধ্যে কাজ শেষ করতে চায়, তাহলে তা বাস্তবে কতটা সম্ভব? বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ছিল ৬৯ শতাংশ এবং নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্যও পাওয়া যায়। অর্থাৎ কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে এগোলেও এখনও বড় একটি অংশ বাকি রয়েছে।
তাই ২০২৮ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু শ্রমিক বা যন্ত্রপাতি বাড়ালেই হবে না; জমি, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ এবং চলমান সড়কে যানবাহন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও একই সঙ্গে সামলাতে হবে। প্রকল্পের অতীত ইতিহাসও এখানে সতর্ক হওয়ার কারণ। মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ শুরু হতে ঋণচুক্তি ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগেছিল। এখন কাজ দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সময়সীমা আবারও বাড়িয়ে ২০৩০ করা হয়েছে।
তারপরও ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সুফল পাওয়া শুরু হয় নির্মাণ শেষ হওয়ার পর। ততদিন পর্যন্ত সরকারকে প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করতে হয়, নির্মাণকাজের কারণে স্থানীয় সড়কে সাময়িক দুর্ভোগ তৈরি হয় এবং ব্যবসায়ীদের পরিবহন পরিকল্পনাতেও বাড়তি চাপ থাকে। কাজ যত দ্রুত শেষ হবে, তত দ্রুত সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে এবং শিল্পাঞ্চল ও রাজধানীর মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় কমানোর সুবিধা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় শূন্য দশমিক ২১৭ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মিলিয়ে সাভার ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ৪৪ কিলোমিটারের একটি নিরবচ্ছিন্ন সিগন্যালমুক্ত যোগাযোগপথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
সিআরসিসির নতুন প্রতিশ্রুতির আসল পরীক্ষা তাই এখন নির্মাণস্থলেই। ২০২৮ সালের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি মান ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে হবে। কারণ একটি দ্রুত নির্মিত কিন্তু দুর্বল অবকাঠামো অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভের চেয়ে বোঝাই হয়ে উঠতে পারে। আর একটি মানসম্মত এক্সপ্রেসওয়ে যদি নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু করা যায়, তাহলে ঢাকার যানজট কমানোর পাশাপাশি সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল ও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর বাণিজ্যিক যোগাযোগেও নতুন গতি আসতে পারে।

