ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের মূল দর্শন হচ্ছে ‘United we stand, united we are committed, united we are dedicated, united we deliver, united we care.’ আমরা স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করি। এর সঙ্গে রয়েছে সহজলভ্যতা ও প্রাপ্যতা, অর্থাৎ আমরা এমন এক সেবা নিশ্চিত করি, যা মানুষ সহজে পেতে পারে। আমরা বাংলাদেশে একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা ব্র্যান্ড, যারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিটি দিকের মানদণ্ড নিশ্চিত করছি ও পুরো ইকোসিস্টেমকে ধারণ করেছি।
আমি দীর্ঘ ২৬ বছর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআর’বি) কাজ করেছি। এরপর নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করেছি। ল্যাবএইডের কাজ আমাকে বিস্মিত করেছে। এখন আমি যুক্ত হয়েছি ইউনাইটেড হেলথ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কেন বললাম, আমরা স্বাস্থ্যসেবার পুরো ইকোসিস্টেম নিয়ে কাজ করি? কারণ আমাদের রয়েছে হাসপাতাল এবং সে হাসপাতালকে ঘিরেই আমরা স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি খাতকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছি।
রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুলে আমাদের ৩০০ বেডের একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রয়েছে, যেখান থেকে এরই মধ্যে প্রথম ব্যাচ পাস করেছে। পাশাপাশি একটি কলেজ অব নার্সিংও রয়েছে। ফলে আমরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উভয় ক্ষেত্রে কাজ করছি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ধানমন্ডিতে আমাদের ‘মেডিক্স’ কার্যক্রম চালু রয়েছে। আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বলেছেন, ঢাকার বাইরে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাতের আরো সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরে জামালপুরে এরই মধ্যে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যারা অর্থ ব্যয় করতে পারে না তাদের জন্য হাসপাতাল রয়েছে। জামালপুরে রয়েছে ২৫০ বেডের এমএ রশিদ হাসপাতাল, শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য রয়েছে স্কুল-কলেজ, বয়স্কদের জন্য বিশেষ সেবা কেন্দ্র। পাশাপাশি বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা ও চশমা দেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এছাড়া ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের অধীনে দুটি কোম্পানি—টেক ভাইটাল ও মেডিপ্যাক রয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি ওয়ান স্টপ মেডিকেল সলিউশন তৈরি করা। এরই মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে মেডিকেল কলেজে আমরা সরঞ্জাম সরবরাহ করছি।
এছাড়া আমরা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কমলাপুরে ও চট্টগ্রামে দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানাতে পারব। কেন আমরা প্রতি বছর আড়াই থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার মেডিকেল ট্যুরিজমে ব্যয় করছি? যার প্রায় অর্ধেক চলে যাচ্ছে ভারতে। আমার ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের হৃৎপিণ্ডে অ্যানাটমি বা ফিজিওলজিতে কি কোনো পার্থক্য আছে? একেবারেই নেই। আমরা দুজনেই মানুষ। তাহলে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে এত বৈষম্য কেন?
আমাদের দেশ থেকে ডাক্তাররা বাইরে গিয়ে একবারে পাস করেছেন, তারা ভালো ডাক্তার হয়েছেন। বিশ্বের বড় হাসপাতালগুলোয় কাজ করছেন, উন্নত পরিবেশে দক্ষতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন। আমাদের দেশেও একই মানের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। আমাদের চিকিৎসকদের মানও ভালো। আমাদের দেশে দক্ষ ডাক্তার ও নার্সের অভাব নেই। প্রকৃতপক্ষে, তাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
বেসরকারি খাতে একের পর এক বড় বড় হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। ইউনাইটেড হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ল্যাবএইড কিংবা এভারকেয়ার হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এখানে কি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই? নিশ্চয়ই আছে। তাহলে অভাব কোথায়? অভাব মূলত দৃষ্টিভঙ্গি ও আস্থার। গণমাধ্যমগুলোর উচিত হাসপাতালের ভুল-ত্রুটি, অনিয়ম বা অন্যায়ের পাশাপাশি ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরা। কারণ এসব হাসপাতালে সত্যিকার অর্থেই উন্নত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
এখন যা প্রয়োজন, তা হলো নিশ্চয়তা ও প্রণোদনা। নিশ্চয়তা দিতে হবে রোগীদের, আস্থা জাগাতে হবে সাধারণ মানুষের মনে। প্রণোদনা দিতে হবে সরকারকে। কীভাবে? যদি আমরা লিভার বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে কিছু সময়ের জন্য বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনতে হবে। তারা এসে কাজ করবেন, দক্ষতা শেয়ার করবেন, তারপর চলে যাবেন। ফলে আমাদের দেশের সক্ষমতা তৈরি হবে কিন্তু বাইরের দক্ষ চিকিৎসক আনার ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা। সরকারের উচিত এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রক্রিয়াগুলো সহজ করা। রোগীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ আস্থা তৈরির ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে চিকিৎসায় শুধু অপারেশনের খরচই সীমাবদ্ধ নয়। একজন রোগীর সঙ্গে যেতে হয় দু-একজন আত্মীয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে ফলোআপের খরচ। একজন রোগীকে পুনরায় যেতে হয়, তখন সঙ্গে থাকেন দু-একজন আত্মীয়। তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া সব মিলিয়ে খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। অথচ এ সেবা আমরা যদি দেশের ভেতরেই উন্নত মানে নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে সে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা থেকে মানুষ বাঁচবে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশের বেসরকারি খাত প্রমাণ করেছে এখানে প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব। সে চিকিৎসা সবার নাগালের মধ্যে পৌঁছে দিতে আমাদের যেসব করণীয়, সরকারের যেসব সহযোগিতা প্রয়োজন, সেগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না, বাস্তবে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন আমাদের দেশে বেসরকারি খাতে বেশ কয়েকটি বড় হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। সরকারের উচিত এ হাসপাতালগুলোর উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বসা, তাদের সমস্যাগুলো শোনা। যদি সরকারের পক্ষ থেকে এসব সমস্যার সমাধান করা না যায়, অন্ততপক্ষে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। সরকার যদি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তারাও আরো শক্তিশালীভাবে এগিয়ে আসতে পারবেন। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে এর সুফল সরাসরি পৌঁছবে সাধারণ মানুষের কাছে।
বেসরকারি খাতই প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সুতরাং তাদের অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রম থেকে আমরা অনেক কিছু গ্রহণ করতে পারি। এজন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে মাশরুমের মতো অনেক ছোট ছোট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠছে। এগুলোর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নেই। বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মহাসচিবকে এখনই খেয়াল রাখা দরকার, নতুন করে যেন আর মানহীন প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠে। যেগুলো এরই মধ্যে রয়েছে, সেগুলোকে মানসম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
ওষুধের প্রায় ৮৫ শতাংশ অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট আমদানি করতে হয় চীন ও ভারত থেকে। কেন এমন হচ্ছে? সামান্য কিছু প্রণোদনা দিলে এগুলো দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। যদি কিছু কোম্পানিকে পালাক্রমে করছাড় দেয়া যায়, তাহলে দেশেই API উৎপাদন শুরু হতে পারে। এতে উৎপাদন খরচও অনেকটা কমে যাবে। আমাদের বর্তমান সরকারের সময় যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানো খুব জরুরি। যদি এখনই তা না করি, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক সরকার এসে হয়তো আরো ভালো সুযোগ তৈরি করবে—কিন্তু তার নিশ্চয়তা নেই। তবে আমি এটুকু বলতে চাই, যে সরকারই আসুক না কেন, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত না করে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। কিন্তু সে বাজেট বাড়ানোর জন্য অর্থের জোগানও থাকতে হবে। সে অর্থকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। গবেষণার প্রসঙ্গে কিছু বলা দরকার। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোয় একই আবহাওয়া, একই ধরনের মানুষ। কিন্তু সেখানে সারা বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায় না। আবার মৌসুমি ডেঙ্গুও আমাদের মতো বিস্তার লাভ করে না। অথচ বাংলাদেশে প্রতি বছরই ডেঙ্গুর মহামারীর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। কেন এমনটা হয়? কারণ তারা সারা বছর ধরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও গবেষণার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে সেখানে ডেঙ্গুর বড় আকারে প্রাদুর্ভাব ঘটে না। কিন্তু আমরা তা করি না। বছর বছর একই দৃশ্য দেখা যায়। যখন প্রাদুর্ভাব শুরু হয় তখন আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি; হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়, মৃত্যুহারও বাড়ে। এ জায়গায় আমাদের গভীরভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন।
কভিড-১৯ মহামারীর সময় আমরা প্রমাণ করেছি, সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে বড় ধরনের সংকট মোকাবেলা সম্ভব। সরকারের নির্ধারিত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি খাত পরীক্ষার মান ধরে রেখেছে, সরকারের নির্ধারিত মূল্যে সেবা দিয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে সবসময় গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ডা. আজহারুল ইসলাম খান: ডিরেক্টর, মেডিকেল সার্ভিসেস, ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড।
সূত্র: বনিক বার্তা

