বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকস (বিএবি) ব্যাংক কোম্পানি আইন, ২০২৫ সংশোধনী নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে। সুপারিশে শেয়ারহোল্ডারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিচালনা সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে বিএবির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞা শুধু স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে একই পরিবারের শেয়ারধারণের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো এবং পরিচালকদের সংখ্যার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিএবি বলেছে, প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্যামেলস, সাস্টেইনেবিলিটি, রিস্ক রেটিং ও পিসিএ ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করতে হবে। এতে ভালো ব্যাংক পুরস্কৃত হবে এবং দুর্বল ব্যাংক কঠোর কাঠামোর মাধ্যমে সংস্কারে বাধ্য হবে। সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, এটি ফলাফলভিত্তিক আইন বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তুলবে।
বর্তমান আইনে পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বামী, স্ত্রী, পিতা, মাতা, সন্তান, ভাই, বোন এবং উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি ধরা হয়। বিএবি জানিয়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পরিবারের সংজ্ঞা সীমিত ও বাস্তবমুখী। ভারতে পরিবার কেবল স্বামী-স্ত্রী বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবার, পাকিস্তানে স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল সরাসরি বংশধর ও ভাইবোন, শ্রীলঙ্কায় স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীল সন্তানকে পরিবার ধরা হয়। বিএবি প্রস্তাব করেছে, ব্যাংকের শেয়ারধারণে বর্তমান ১০ শতাংশ সীমা বাতিল করা হোক। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডাররা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার রাখতে পারবে। সংগঠনটির যুক্তি, উচ্চমাত্রার শেয়ার মালিকদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও সুশাসন জোরদার হয়। এতে ব্যাংকের স্থিতিশীলতা, দক্ষতা ও মুনাফা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান আইনে শেয়ারহোল্ডারদের ভোটাধিকারে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার থাকলেও মোট ভোটের ৫ শতাংশের বেশি প্রয়োগ করা যাবে না। বিএবি এটি বাতিলের সুপারিশ করেছে। তারা বলেছে, বর্তমান ‘এক শেয়ার, এক ভোট’ নীতি সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এটি প্রয়োজন। বর্তমান আইন অনুযায়ী, একই পরিবারের তিনজনের বেশি সদস্য এক সময় ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়া অনুযায়ী সীমা কমিয়ে দুজন করা হয়েছে। বিএবি শিথিল করার সুপারিশ করেছে। প্রতিটি ব্যাংকে সর্বোচ্চ ২০ জন পরিচালক হতে পারে, যার ২-৩ জন অবশ্যই স্বতন্ত্র পরিচালক। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সর্বোচ্চ ১৫ জন পরিচালক ও ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র রাখতে বলা হয়েছে। বিএবি বিরোধিতা করেছে, বলেছে আগের নিয়মই যথেষ্ট।
বর্তমান আইন অনুযায়ী এক ব্যাংকের শেয়ারধারক অন্য ব্যাংকের শেয়ার রাখতে পারেন। প্রস্তাবিত খসড়ায় সীমা ২ শতাংশে রাখা হয়েছে। বিএবি এটি বাতিলের সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, এটি বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ সীমিত করবে এবং বাজার তারল্য কমাবে। বর্তমান আইনে পরিচালক সর্বোচ্চ ১২ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। প্রস্তাবিত খসড়ায় ৬ বছর করা হয়েছে। বিএবি বলেছে, মেয়াদ ৯ বছর রাখা উচিত। দীর্ঘমেয়াদি পরিচালকের ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীর আস্থা ও কৌশলগত নেতৃত্বের জন্য জরুরি।
বর্তমান আইন অনুযায়ী খেলাপি ঋণের কারণে পদ শূন্য হলে ১ বছরের জন্য পুনঃনিযুক্তি বন্ধ। প্রস্তাবিত খসড়ায় ৩ বছর বলা হয়েছে। বিএবি ৬ মাসের সীমা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী একজন পরিচালক একই সময়ে অন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা বিমা কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন না। বিএবি সুপারিশ করেছে, সীমাবদ্ধতা শুধু অন্য ব্যাংক কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য করা হোক। এতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ পরিচালকের ব্যাংকিং খাতে অংশগ্রহণ সহজ হবে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা বজায় থাকবে।

