মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসায় নতুন করে মোটা অঙ্কের ফি আরোপের ঘোষণায় বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলো। এতে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরাসরি এর প্রভাব পড়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে।
গত শুক্রবার নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ইনফোসিসের আমেরিকান ডেপোজিটরি রিসিপ্টস (এডিআর) ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৯৭ ডলারে। উইপ্রোর এডিআরও পড়ে যায় ২ দশমিক ১০ শতাংশ, দাম দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮০ ডলার। ভারতের ওপর নির্ভরশীল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কগনিজ্যান্টের শেয়ার দরও কমে যায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা ৬৬ দশমিক ৯৪ ডলারে এসে ঠেকে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ভারতীয় আইটি খাতের জন্য বড় ধাক্কা। ভিসার নতুন ফি বছরে ১ লাখ ডলার ধরা হয়েছে। বহু বছর ধরে ভারতীয় সফটওয়্যার রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রে যে মডেলের ওপর ভর করে ব্যবসা করে আসছিলেন, এই সিদ্ধান্ত সেটিকেই সরাসরি আঘাত করেছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ইনফোসিস ও উইপ্রো। এই দুটি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাহকদের কাছে হাজার হাজার ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার পাঠায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেয়ারবাজারে এই প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সোমবার ভারতের বাজার খুললে আইটি খাতের শেয়ারগুলো বড় ধাক্কা খেতে পারে।
রিলায়েন্স ব্রোকিংয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অজিত মিশ্র বলেন, শুক্রবার ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে বাজার যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তার প্রতিফলন আগামী সপ্তাহের শুরুতে ভারতের বাজারেও দেখা যাবে। রপ্তানিনির্ভর খাতগুলো আগেই শুল্কচাপে আছে, নতুন নিয়ম আইটি খাতকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলবে। আরেকজন বিশ্লেষক জানান, আইটি শেয়ারের পরিস্থিতি আগেই দুর্বল। সোমবার বাজার খোলার পর প্রযুক্তি শেয়ারগুলো নিম্নমুখী হতে পারে।
গত আট মাসে ইনফোসিস ও টিসিএসের শেয়ারদর উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিএসইতে ইনফোসিস তার ৫২-সপ্তাহের সর্বোচ্চ ১৫৪০ দশমিক ৩০ রুপি থেকে পড়ে গেছে ২৩ শতাংশ। টিসিএসও ৪ হাজার ৪৯৪ রুপি থেকে নেমে এসেছে ৩১৬৯ দশমিক ৮৫ রুপিতে, যা ২৯ শতাংশের বেশি পতন। শীর্ষ ভারতীয় আইটি কোম্পানি টেক মাহিন্দ্রা ও এইচসিএল টেকনোলজিসও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার সরাসরি ভিসা নিয়মের চাপে পড়বেন।
বিশ্বজুড়ে ইনফোসিসের কর্মী সংখ্যা ৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৮। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছে। টিসিএসের কর্মী সংখ্যা ৬ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি। কেবল উত্তর আমেরিকাতেই তাদের ৪৬ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছে, যাদের বড় অংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের প্রচলিত মডেল হুমকির মুখে। ফি বাতিল না হলে কোম্পানিগুলোকে হয় স্থানীয়ভাবে আরও কর্মী নিতে হবে, নয়তো কাজের বড় অংশ ভারতেই সরিয়ে নিতে হবে। এই প্রভাব কেবল কর্পোরেট মুনাফার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি ভারতীয় ইঞ্জিনিয়াররা দেশে ফিরতে বাধ্য হন, তবে রেমিট্যান্সেও বড় ধাক্কা আসতে পারে। বিশ্বে সর্বাধিক রেমিট্যান্স পাওয়া দেশ ভারত ২০২৪ সালে পেয়েছে ১২৯ বিলিয়ন ডলার। এর ২৮ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স কমলে বিশেষ করে কেরালা, উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যের পরিবারগুলো বেশি বিপাকে পড়বে। ইনফোমেরিকস ভ্যালুয়েশন অ্যান্ড রেটিংস লিমিটেডের প্রধান অর্থনীতিবিদ মনোরঞ্জন শর্মা বলেন, প্রবাসীদের ওপর চাপ বাড়লে এসব পরিবারের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন মেটানো কঠিন হয়ে যাবে।

