বিশ্ববাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই বড় একটি বাস্তবতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এবার সরাসরি বড় কোনো ঘোষণার নাটকীয়তা ছিল না, ছিল না হোয়াইট হাউসের বাগানে দাঁড়িয়ে দেশভিত্তিক শুল্কের তালিকা দেখানোর আয়োজন। তবুও সিদ্ধান্তটি ছোট নয়। বরং বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক নতুন কৌশল, যা আগের তুলনায় আইনি দিক থেকে বেশি শক্ত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক বাণিজ্যের দিক পরিবর্তন করতে পারে।
চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে চালানো বৈশ্বিক শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। আদালত মনে করেছিল, ওই আইনের ব্যবহার করে এত বড় পরিসরে শুল্ক আরোপ করা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সেই রায়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি হয়তো বড় ধাক্কা খেল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন নতুন আইনি পথ ধরে একই ধরনের চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।
এই নতুন পথে সামনে এসেছে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর ২ জুন ঘোষণা করে, তারা এই ধারার অধীনে তথাকথিত ৬০ অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও রয়েছে। ফলে বাস্তবে ৮০টির বেশি দেশ এই উদ্যোগের আওতায় পড়ে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত শুল্কের হার সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে চাইছে। তালিকায় শুধু বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ব্রিটেন, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও রয়েছে। এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এটি শুধু বাণিজ্যিক বিরোধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সম্পর্কের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদাররা জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, এতে মার্কিন শ্রমিকরা বৈশ্বিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যুক্তরাষ্ট্র আর এই বৈষম্য মেনে নেবে না।
তবে প্রশ্ন হলো, জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কি এই শুল্কনীতির একমাত্র উদ্দেশ্য, নাকি এর পেছনে বাণিজ্য আলোচনায় চাপ তৈরির বড় কৌশলও কাজ করছে? বাণিজ্য বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ দ্বিতীয় দিকটিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্র আগের শুল্কনীতির বড় অংশে আইনি দুর্বলতায় পড়ে যায়। তাই এখন ৩০১ ধারাকে নতুন চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
৩০১ ধারার বিশেষত্ব হলো, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি বাণিজ্যচর্চা তদন্তের সুযোগ দেয়। কোনো দেশের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার জন্য অন্যায্য, অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক মনে হলে, তদন্ত শেষে শুল্ক বা আমদানি নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়। জরুরি ক্ষমতা আইনের তুলনায় এই প্রক্রিয়া ধীর, কিন্তু আদালতে টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। কারণ এখানে তদন্ত, মতামত গ্রহণ এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ধাপ রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ৬০ অর্থনীতির বিরুদ্ধে ৩০১ ধারায় তদন্ত শুরু করে। পরে বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর জানায়, তদন্তে দেখা গেছে, এসব অর্থনীতি জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায়, এটি অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক এবং মার্কিন বাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরি করে।
প্রস্তাব অনুযায়ী আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গুয়াতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্যের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এসব দেশের পূর্ণ বা আংশিক কিছু কর্মসূচি রয়েছে। অন্যদিকে বাকি ৪৫ দেশের ক্ষেত্রে ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনাম রয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার ওপর আগ্রহী পক্ষগুলো ৬ জুলাই পর্যন্ত লিখিত মতামত জমা দিতে পারবে। এরপর ৭ জুলাই শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি এখনো চূড়ান্ত নয়, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিচ্ছে, তারা শুল্ককে আবারও বৈদেশিক বাণিজ্যনীতির কেন্দ্রীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
এই পরিস্থিতি বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড় তৈরি করতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচাপ বাড়লে বিভিন্ন দেশ নিজেদের বাণিজ্য নির্ভরতা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়। ভারতভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনজীবী শান্তনু সিং ও বিক্রম নায়েকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি দেশগুলোকে দ্রুত বিকল্প বাণিজ্য সম্প্রসারণে উৎসাহিত করছে। তাঁদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মেরকোসুরের চুক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের বাণিজ্যচুক্তি এই প্রবণতার উদাহরণ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মেরকোসুরের মধ্যে ১ মে কার্যকর হওয়া চুক্তি ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়েকে নিয়ে ৭০ কোটি মানুষের একটি বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছে। আবার জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের বাণিজ্যচুক্তি আরও বড়। ইউরোপীয় নেতারা একে সবচেয়ে বড় চুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই চুক্তির মাধ্যমে ২০০ কোটি মানুষের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বড় বড় বাণিজ্য জোট তৈরি হওয়ার প্রবণতা আরও জোরদার হচ্ছে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। শুল্কের মাধ্যমে সাময়িক চাপ তৈরি করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে অংশীদাররা বিকল্প পথ খুঁজে নিতে পারে। দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বা নীতির অনিশ্চয়তা এড়াতে নিজেদের মধ্যে নতুন চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বাণিজ্য শুধু পণ্যের প্রবাহ নয়; এটি বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও বিষয়। তাই শুল্কচাপ কেবল আমদানির খরচ বাড়ায় না, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তও বদলে দেয়।
বৈশ্বিক বাণিজ্য গবেষণা উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টের ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনায় অনেকটা চাপ হারিয়েছিল। এখন ৩০১ ধারার তদন্ত সেই চাপ ফিরিয়ে আনার নতুন কৌশল হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই শুল্কের হুমকি দেশগুলোকে বিদ্যমান চুক্তি থেকে সরে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং ভারতসহ অন্য দেশগুলোকে দ্রুত আলোচনা শেষ করতে চাপ দিতে পারে।
অন্যদিকে আটলান্টিক কাউন্সিলের ভূ-অর্থনীতি কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ম্যাডেলিন চালেকি মনে করেন, প্রশাসনের দরকার ছিল এমন একটি আইনি ভিত্তি, যা আগের তুলনায় বেশি স্থায়ী হবে। ৩০১ ধারা ২০১৮ সাল থেকে চীনের ওপর শুল্ক আরোপে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ট্রাম্প ও বাইডেন—দুই প্রশাসনই এটি ব্যবহার করেছে। তাঁর মতে, এই ধারাটি বিদেশি বাণিজ্যচর্চার বিরুদ্ধে শুল্কভিত্তিক প্রতিকার দেওয়ার জন্যই তৈরি।
তবে এই প্রক্রিয়া দ্রুত নয়। জরুরি ক্ষমতা আইনের মতো রাতারাতি শুল্ক আরোপ, কমানো বা স্থগিত করার সুযোগ এখানে নেই। ৩০১ ধারায় পরিবর্তন আনতে হলে তদন্তের নথি, জনমত গ্রহণ এবং আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাই এই পথ ধীর হলেও আইনি দিক থেকে বেশি স্থিতিশীল। চালেকির ভাষায়, প্রশাসন দ্রুততা ও একক সিদ্ধান্তের সুবিধা ছেড়ে বেশি স্থায়িত্ব ও আইনি নিশ্চিততার দিকে যাচ্ছে।
তবে সমালোচনাও কম নয়। ভারতভিত্তিক বাণিজ্য আইনজীবী সিং ও নায়েক মনে করেন, কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরকে যে ক্ষমতা দিয়েছে এবং পূর্ববর্তী নজির বিবেচনায় এই নতুন শুল্ক আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকি কম। কিন্তু প্রক্রিয়ার দ্রুততা ও সংক্ষিপ্ততা নিয়ে উদ্বেগ আছে। অর্থাৎ আইনগত ভিত্তি শক্ত হলেও বাস্তবায়নের ধরন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
লক্ষ্যভুক্ত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে আপত্তি জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে, তারা নিজস্বভাবে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র কেন তাদের এই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করল, সে প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় কমিশনের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক উপমুখপাত্র ওলফ গিল জানিয়েছেন, কমিশন তদন্তের প্রাথমিক ফলাফল সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মনে করে, এই ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ অযৌক্তিক।
চীনও এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়ংছিয়ান অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমের অজুহাতে একতরফা বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। চীনের বক্তব্যে বোঝা যায়, তারা এই পদক্ষেপকে শ্রম অধিকার রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্যচাপের অংশ হিসেবে দেখছে।
ভারত তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা চলছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৩০১ ধারার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পাশাপাশি ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ঘোষিত কাঠামো চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়েও দুই দেশ আলোচনা করছে। ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে একটি সমঝোতার দিকে এগিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কব্যবস্থা বাতিল করার পর আলোচনা কিছুটা গতি হারায়।
এই নতুন শুল্ক বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা নাও লাগতে পারে—এমন মতও আছে। অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, কারণ এটি একসঙ্গে বহু বাণিজ্য অংশীদারকে লক্ষ্য করছে। কিন্তু এর বড় চাপ পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ওপর। বেশি শুল্ক মানে আমদানি খরচ বৃদ্ধি, ব্যবসার অনিশ্চয়তা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং মার্কিন ভোক্তা ও উৎপাদকদের জন্য বেশি দাম।
এই যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে শুল্ক আরোপ করলে বিদেশি পণ্যের দাম বাড়ে। এতে স্থানীয় উৎপাদক কিছুটা সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু ভোক্তারা বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়। আবার অনেক মার্কিন উৎপাদক নিজেরাই বিদেশি কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শুল্ক তাদের উৎপাদন খরচও বাড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত চাপটি শুধু বিদেশি রপ্তানিকারকের ওপর পড়ে না; আমদানিকারক, উৎপাদক, খুচরা ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ে।
ম্যাডেলিন চালেকির বিশ্লেষণও একই ধরনের সতর্ক সংকেত দেয়। তাঁর মতে, ৩০১ ধারার শুল্ক একা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেবে না, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের সঙ্গে বাণিজ্য অংশীদাররা আগেই পরিচিত। কিন্তু যদি এই পদক্ষেপ সফল হয়, তাহলে এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাসকে দ্রুত করতে পারে।
এই পুনর্বিন্যাসের অর্থ হলো, ব্যবসাগুলো নিজেদের সরবরাহ শৃঙ্খল নতুনভাবে সাজাবে, বিনিয়োগের গন্তব্য বদলাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় উপস্থিতি ছাড়াই আঞ্চলিক বা খাতভিত্তিক বাণিজ্যচুক্তি বাড়তে পারে। সরকারগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিকল্প অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে। ফলে শুল্কের সরাসরি প্রভাবের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক উদ্যোগ তাই শুধু শ্রম অধিকার বা আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা, আদালতের সীমাবদ্ধতার পর নতুন আইনি ভিত্তি খোঁজার কৌশল এবং অংশীদার দেশগুলোর ওপর আলোচনার চাপ তৈরির উপায়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে। কারণ বিশ্ববাণিজ্য এখন আগের চেয়ে বহুমুখী। বড় বাজার শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়; ইউরোপ, ভারত, দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া—সবখানেই নতুন জোট ও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ৩০১ ধারার এই শুল্ক উদ্যোগ হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাণিজ্যে বড় বিস্ফোরণ ঘটাবে না। কিন্তু এটি বাণিজ্যের মানচিত্রে ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি শুল্ককে দীর্ঘমেয়াদি নীতির অংশ করে তোলে, তাহলে অন্য দেশগুলোও নিজেদের পথ খুঁজবে। তখন প্রশ্ন থাকবে—যুক্তরাষ্ট্র কি শুল্কচাপ দিয়ে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে পারবে, নাকি এই চাপই বিশ্ববাণিজ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন কেন্দ্রের দিকে ঠেলে দেবে?

