বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ চীন প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্টভাবে নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। জাতিসংঘে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানান, ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো অর্থনীতিতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমানো হবে। তিনি আরও বলেন, চীন এর চেয়েও ভালো করার চেষ্টা করবে।
এই ঘোষণা এলো এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে ‘প্রতারণা’ বলে মন্তব্য করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের পরিকল্পনা বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। গ্রিনপিস ইস্ট এশিয়ার উপদেষ্টা ইয়াও ঝে বলেন, “প্রত্যাশা যতই কম হোক, আজ যা ঘোষণা করা হলো তা এখনও যথেষ্ট নয়।” আগামী নভেম্বরে ব্রাজিলে বসবে বিশ্বনেতাদের সম্মেলন ‘কপ৩০’। তবে এর আগেই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বৈঠক গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ নতুন জলবায়ু পরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময় প্রায় শেষ।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর পর দেশগুলো নতুন প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রায় ২০০ দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার অঙ্গীকার করেছিল। নতুন প্রতিশ্রুতির সময়সীমা ছিল ফেব্রুয়ারি ২০২৫। এ সময়ের মধ্যে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। অনেক দেশ এখনও সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার আগে পরিকল্পনা জমা দিতে চাইছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, নিঃসরণে বড় ধরনের হ্রাস না ঘটলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা রক্ষা সম্ভব হবে না। তার ভাষায়, “দেশগুলোকে এমন পরিকল্পনা দিতে হবে যাতে পুরো অর্থনীতি এবং সব ধরনের নিঃসরণ অন্তর্ভুক্ত হয়।”
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দূষণকারী দেশ হওয়ায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে শি ঘোষণা করেছিলেন, এই দশকে চীনের নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং ২০৬০ সালের মধ্যে দেশটি কার্বন নিরপেক্ষ হবে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্ট নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করলেন তিনি। এই ঘোষণায় কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও সব ধরনের গ্রিনহাউস গ্যাস অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শি জিনপিং জানান—
- ২০২০ সালের তুলনায় ছয় গুণ বেশি বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে,
- বনভূমি ২৪ বিলিয়ন ঘনমিটার বাড়াবে,
- নতুন গাড়ির বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত গাড়িকে প্রধান ধারায় আনবে।
চীনের নিঃসরণ এত বেশি যে সামান্য হ্রাসও বৈশ্বিক জলবায়ুতে বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৩ সালে একাই তারা বৈশ্বিক নিঃসরণের এক চতুর্থাংশের বেশি করেছে। পরিমাণ প্রায় ১৪ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য। ১০ শতাংশ কমালে তা বছরে ১.৪ বিলিয়ন টন হ্রাস পাবে—যা যুক্তরাজ্যের বার্ষিক নিঃসরণের চার গুণ।
তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি যথেষ্ট নয়। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের বিশ্লেষক লাউরি মাইলিভির্তা বলেন, “৩০ শতাংশের কম হ্রাস ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্যর সঙ্গে মেলে না।” তার মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে চীনকে অন্তত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নিঃসরণ কমাতে হবে।
চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বারবার প্রতিশ্রুতির চেয়ে এগিয়ে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ২০০ গিগাওয়াট বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও ২০২৪ সালেই তা পূর্ণ হয়েছে। চায়না ক্লাইমেট হাবের পরিচালক লি শু বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা সীমা নয় বরং ভিত্তি। তার মতে, চীনের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি আগামী দশকে দেশটিকে আরও এগিয়ে নেবে।
তবে চীন এখনও ব্যাপকভাবে কয়লার ওপর নির্ভরশীল। গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার নতুন রেকর্ড গড়েছে। যদিও প্রাথমিক তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে সৌরবিদ্যুতের প্রবৃদ্ধির কারণে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। লি শু আরও বলেন, “চীনের নিঃসরণ স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের নিঃসরণ ২০২৪ সালের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” তার ভাষায়, এটি ‘দ্রুত বৃদ্ধির যুগ শেষ করে কার্বন হ্রাসের যুগে প্রবেশ’।

