স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার জেলা কুমিল্লায় সড়ক ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ যাচ্ছে তাঁর নিজ উপজেলা মুরাদনগরে—৪৫৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে দেবীদ্বারে, যা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এলাকা। সেখানে বরাদ্দ ৩৩৮ কোটি টাকা।
একই সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদের জেলা সাতক্ষীরার জন্যও নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার আরেকটি বড় প্রকল্প। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন এই প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। সূত্র বলছে, এত বড় একক প্রকল্প আগে খুব কম জেলাতেই নেওয়া হয়েছে।
জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদ। পরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। এরপর তাঁকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে তাঁর জেলা কুমিল্লায় এই প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করবেন। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা উন্নয়ন প্রকল্পকে “উপদেষ্টার উপহার” বলে প্রচার করছেন। বিএনপি অভিযোগ তুলেছে, সরকারি অর্থে উন্নয়ন করে আসিফ মাহমুদ নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় নেতা উবায়দুল সিদ্দিকী বলেন, “এটি সরকারের উন্নয়ন, কোনো ব্যক্তিগত প্রচারণা নয়।”
ডিপিপি অনুযায়ী, কুমিল্লার প্রকল্পে সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, সড়ক ইউনিব্লক দিয়ে শক্তকরণ এবং বাজার উন্নয়ন করা হবে। সাতক্ষীরার প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মৎস্য ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, ভোমরা স্থলবন্দরকেন্দ্রিক সড়ক উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে। প্রথমে কুমিল্লায় প্রকল্পের প্রস্তাব ছিল ২ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা এবং সাতক্ষীরায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। পরে ব্যয় কমিয়ে আনা হয়। কুমিল্লার প্রকল্প এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায়, সাতক্ষীরার প্রস্তাব এখনো মন্ত্রণালয়ে ফেরত রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের অনেক জেলার সড়ক আরও বেশি ভাঙাচোরা হলেও সেখানে কোনো একক প্রকল্প নেই। এলজিইডির তথ্যমতে, কুড়িগ্রামের ৭০ শতাংশ উপজেলা সড়ক নষ্ট। গত অর্থবছরে তাদের চাহিদা ছিল ৮০ কোটি টাকা, বরাদ্দ মেলে মাত্র ৪০ কোটি। স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী ইউনুছ হোসেন জানান, অর্থের অভাবে মানুষের দাবি পূরণ করা যাচ্ছে না। নোয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জেলার পরিস্থিতিও একই রকম।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপদেষ্টা ও সচিবের নিজ নিজ জেলায় এভাবে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। তিনি প্রশ্ন রাখেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী আসিফ মাহমুদ এখন কি নিজেই সেই বৈষম্য চর্চা করছেন? টিআইবির মতে, একনেকে এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলে উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও পিছিয়ে থাকা জেলাগুলো ন্যায্য বরাদ্দ পাচ্ছে না। এতে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ন্যায় ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

