সরকার যখন পাঁচটি সংকটাক্রান্ত শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একক রাষ্ট্রীয় সংস্থায় মিলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই রেসিপি কি প্রয়োগ হবে? দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো অল্প সময়ের জন্যই বেঁচে আছে। ঋণ খেলাপি এবং পুঁজির ঘাটতি ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় সরকার বারবার ট্যাক্সদাতাদের অর্থ ঢেলে পুনঃপুঁজিকরণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেএবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকুব), যারা কৃষি ঋণ সম্প্রসারণের দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিকেএবি, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত, কৃষকদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পর আজ এই ব্যাংক ধ্বংসের ধারেকাছে। ধারাবাহিক ক্ষতি, পুঁজির ঘাটতি, ঋণ খেলাপি, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একসময় কৃষকদের আশা কেন্দ্রকে রাষ্ট্রের বোঝায় পরিণত করেছে। এটি শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
১৯৮৬ সালে রাকুব গঠন করা হয়, বিকেএবির রাজশাহী অঞ্চলের শাখাগুলো আলাদা করে। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় ঋণ বিতরণ আরও কার্যকর করা। কিন্তু দুই ব্যাংকেরই ক্ষতি এবং পুঁজির ঘাটতি বাড়ছে। দীর্ঘদিন নীতি নির্ধারকরা দুই ব্যাংককে একত্রিত করার বিষয়ে ভাবছেন। এতে প্রশাসনিক খরচ কমানো, ঋণ ব্যবস্থাপনা একীভূত করা এবং সেবা সরলীকরণ সম্ভব। তবে নীরব প্রশাসনিক জড়তা ও অনিশ্চয়তার কারণে এই উদ্যোগ আটকে আছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ছয় অর্থবছরে বিকেএবি প্রায় ১৯১ বিলিয়ন টাকা ক্ষতি করেছে। চলতি জুন পর্যন্ত ব্যাংকের পুঁজির ঘাটতি ২৯২ বিলিয়ন টাকা (২৯,২০৭ কোটি), আর রাকুবের ঘাটতি প্রায় ২৫ বিলিয়ন টাকা। ক্ষতি ও পুঁজির ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় দুই ব্যাংকের কার্যক্রম ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। এটি আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণে প্রভাব ফেলছে, সরাসরি কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে সম্প্রতি এনপিএল (নন-পারফর্মিং লোন) সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তন।
জানা গেছে, বিকেএবির খেলাপি ঋণ জুন ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৪৩.২৯ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ১৭৫.৩৮ বিলিয়ন টাকা হয়েছে। একই সময়ে ডিফল্ট রেট ১২.৭২% থেকে ৪৯.৪৪% পৌঁছেছে। কেন এমন হঠাৎ বৃদ্ধি? আগের নিয়মে ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো ছয় মাস পর। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায়, যা আইএমএফ শর্ত অনুযায়ী এসেছে, ঋণ তিন মাসেই খেলাপি ধরা হচ্ছে। বর্ষার ধানজাত কৃষি ঋণ এমন ছোট সময়সীমায় ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। এর ফলে হাজার হাজার কৃষককে অন্যায়ভাবে ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
কৃষি ঋণের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ঋণ শর্তের সময়সীমা ছয় মাসে পুনঃস্থাপন করা উচিত। রিস্কেডিউলিং নীতিতে কৃষকদের জন্য ছাড় দেওয়া প্রয়োজন, যাতে মৌসুমী সমস্যার কারণে তারা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত না হন। কৃষি ব্যাংকিংয়ে কমার্শিয়াল ব্যাংকের নিয়ম প্রযোজ্য নয়। প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং ফ্যাকশনালিস্ট সংঘাতও বিকেএবির সংকট বাড়াচ্ছে। এক বছরের মধ্যে প্রায় ৪,৯০৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী স্থানান্তরিত হয়েছেন, অনেকে একাধিকবার। স্থানান্তর বা পদোন্নতির জন্য ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট স্থানান্তর, নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ করছে। পার্টি আনুগত্যকে পেশাদারিত্বের উপরে রাখা, ঘুষ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে ভেঙে দিয়েছে। বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কৃষি ব্যাংককে এই পরিস্থিতিতে ফেলা যায় না। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। স্থানান্তর ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। দক্ষ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষ পরিবেশ ছাড়া সঠিক প্রশাসন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক শুধুই আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ কৃষিকাজে নির্ভরশীল। ব্যাংক দুর্বল থাকলে প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। ব্যাংক শক্তিশালী হলে অনেকে মাইক্রোক্রেডিট বা গ্রামীণ সঙ্ঘাতের ফাঁদে পড়ে না। তাই ব্যাংকের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শক্তিশালী করা জরুরি। সরকারের, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতি নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দূর্ণীতি ও অপব্যবস্থার জন্য ফরেনসিক অডিট করা জরুরি এবং ব্যাংককে পুনঃগঠন করতে হবে। নির্ধারিত পদক্ষেপ ব্যতীত বিকেএবি রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে থাকবে।
বিকেএবি ও রাকুব একই লক্ষ্য শেয়ার করছে এবং আর্থিকভাবে দুরবস্থায় আছে। দুই ব্যাংককে একত্রিত করলে ক্ষতির সংখা কমানো সম্ভব। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, সুষ্ঠু প্রশাসন এবং স্বচ্ছ ঋণ বিতরণ সহ এক বিশেষায়িত ব্যাংক কৃষকদের অনেক বেশি কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারবে এবং কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

