সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিদ্যমান নানা চাপের মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্য অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি বিবেচনায় বাজেটে নির্ধারিত বেশ কয়েকটি প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অনেকটাই উচ্চাভিলাষী।
তার মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রয়োজন। কিন্তু জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন দুর্বলতা এখনো এসব খাতের বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এক বছরের মধ্যে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সিপিডি। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ ঘাটতি পূরণে দেশীয় ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়ার পাশাপাশি সুদের হারও বাড়তে পারে।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অতীত অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বড়। আগের বছরগুলোতেও রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি ছিল। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যের ভিত্তিতে করা প্রবৃদ্ধি-সংক্রান্ত অনুমান বাস্তব আর্থিক অবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে বাজেটের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি। সৌর প্যানেলের ওপর শুল্ক অব্যাহতি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রণোদনাকে সিপিডি পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, যা ইতিবাচক বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং অপচয় কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে এটি প্রথম বাজেট। ফলে প্রয়োজনীয় কিন্তু কঠিন কাঠামোগত সংস্কার শুরু করার জন্য এটিই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। উদাহরণ হিসেবে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসন কার্যক্রমকে পৃথক করার বিষয়টি তুলে ধরেন। তার ভাষায়, এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার অপরিহার্য।

