২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সরকারের মোট ব্যয়ের আকার কিছুটা কমানো হলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, কৃষিঋণ মওকুফ এবং বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের প্রয়োজন মেটাতে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাজেট নথি অনুযায়ী, মূল বাজেটে ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৫৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এর ফলে মোট বাজেটের আকার ২ হাজার কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়।
সংশোধিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ পেয়েছে অর্থ বিভাগ। বিভাগটির বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ২৮ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। যদিও উন্নয়ন ব্যয়ে কিছুটা কাটছাঁট করা হয়েছে, তবে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ, শেয়ার মূলধনে বিনিয়োগ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ বাড়তি ব্যয়ের কারণে এই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়েছে বলে বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল বাজেটে কমিশনের জন্য ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৪ হাজার ৩৪৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার ৩৮৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হওয়ায় এই বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কমিশনের দুটি চলমান প্রকল্পের জন্যও অতিরিক্ত অর্থ রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে ১২ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এই অর্থ থোক বরাদ্দ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা সাধারণত জরুরি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত ৪ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা পেয়েছে। বাজেট নথিতে একটি চলমান প্রকল্পের কথা উল্লেখ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মূলত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অর্থায়নের প্রয়োজন থেকেই এ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগকে অতিরিক্ত ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে ২ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ খাতে মেরামত ও সংরক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়াকে এই অতিরিক্ত বরাদ্দের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পেয়েছে অতিরিক্ত ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফ কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত ৬৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বেড়েছে ৩০২ কোটি টাকা।
পণ্য ও সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের বাজেট স্থানান্তরের কারণে আইন ও বিচার বিভাগ অতিরিক্ত ৮৫ কোটি টাকা পেয়েছে। জননিরাপত্তা বিভাগ অ-আর্থিক সম্পদ ও বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত ১৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে মাত্র ১২টি প্রতিষ্ঠানই ৫৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা পেয়েছে, যা মোট অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রায় ৯৭ শতাংশ। বাকি ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ভাগ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সংশোধিত বাজেটের এ পরিবর্তন সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম এবং চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের প্রয়োজন বিবেচনায় করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, ধীরগতির ব্যয় এবং ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ কমানো হয়েছে। ফলে সামগ্রিক বাজেটের আকারও কিছুটা ছোট হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ জনসেবামূলক কয়েকটি মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারেনি। এ কারণেই সংশোধিত বাজেটে এসব মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমিয়ে আনা হয়েছে।

